রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় এক স্কুলশিক্ষকের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। দিনের পর দিন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং সংসার পাতার মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে এক প্রবাসী নারীর কাছ থেকে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই শিক্ষক। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর হিসাব করলে এই টাকার পরিমাণ প্রায় ৪০,০০০$ (ডলার) বা তারও বেশি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে বাড়ি বানানোর পর এখন বিয়ে করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন অভিযুক্ত শিক্ষক। এই ঘটনায় প্রতারণার শিকার ওই নারী চরম হতাশা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের নাম মুনসুর রহমান। তিনি বাগমারা উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের পোড়াকয়া গ্রামের বাসিন্দা এবং স্থানীয় আক্কেলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক।
ভুক্তভোগী ওই নারী সাংবাদিকদের কাছে তাঁর জীবনের এই কষ্টের গল্প তুলে ধরেন। তিনি জানান, নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য বদলানোর আশায় ২০১৮ সালে তিনি প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানে পাড়ি জমান। সেখানে অনেক কষ্ট করার পর পরবর্তীতে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েও দীর্ঘ সময় কাজ করেন। একজন নারী হিসেবে প্রবাসে একা থাকা এবং টাকা জমানো কতটা কষ্টের, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। দেশে ফেরার পর আত্মীয়তার সূত্র ধরে শিক্ষক মুনসুর রহমানের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। সেই সাধারণ পরিচয় একসময় গভীর প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। মুনসুর রহমান তাঁকে বিয়ের আশ্বাস দেন এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ সংসারের রঙিন স্বপ্ন দেখান। সেই বিশ্বাস থেকেই ওই নারী একটু একটু করে তাঁর জমানো টাকা মুনসুরের হাতে তুলে দিতে শুরু করেন।
প্রবাসী ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের কথা বলে বাড়ি নির্মাণসহ নানা অজুহাতে মুনসুর রহমান তাঁর কাছ থেকে মোট ৪৮ লাখ ৭ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন। এই প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের উপযুক্ত প্রমাণও তাঁর কাছে খুব যত্ন করে সংরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে ফিরে তিনি সরাসরি মুনসুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সামাজিকভাবে আনুষ্ঠানিক বিয়ে না হলেও মুনসুরের বিয়ের প্রতিশ্রুতির ওপর ১০০% বিশ্বাস রেখে তাঁরা প্রায় আট মাস স্বামী-স্ত্রীর মতো একই ছাদের নিচে বসবাস করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি মুনসুরকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে পুরোপুরি বিশ্বাস করে ফেলেন এবং নিজের জীবনের সব সঞ্চয় নির্দ্বিধায় তাঁর হাতে তুলে দেন।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন ওই নারী সামাজিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের জন্য মুনসুরকে চাপ দিতে শুরু করেন। বিয়ের কথা উঠতেই মুনসুর রহমানের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। তিনি নানা টালবাহানা ও অদ্ভুত সব অজুহাত দেখাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি এত বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়ার বিষয়টিও পুরোপুরি অস্বীকার করে বসেন। পরিস্থিতি খারাপ বুঝতে পেরে ওই প্রতারক শিক্ষক এলাকা ছেড়ে গোপনে অন্যত্র অবস্থান নিতে শুরু করেন। ভুক্তভোগী নারীর দাবি, বর্তমানে তিনি মুনসুরের যে বাড়িতে অবস্থান করছেন, সেই দৃষ্টিনন্দন বাড়িটিও মূলত তাঁরই কষ্টার্জিত টাকায় বা অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ এখন সেই নিজের টাকায় বানানো বাড়ি থেকেই তাঁকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বর্তমানে ওই নারী চরম নিরাপত্তাহীনতা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ দেশে ফিরে সেই রেমিট্যান্স যোদ্ধারাই যদি এমন প্রতারণার শিকার হন, তবে তা সত্যিই খুব হতাশাজনক। তিনি অভিযোগ করেন, মুনসুর রহমানের পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে তাঁকে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছেন। তাঁর ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ব্যাংকের চেকবই, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র এবং ব্যাগে থাকা নগদ অর্থও তারা জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য স্বজনদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি তাঁদের মেরে ফেলার বা প্রাণনাশের সরাসরি হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান।
জীবনের সব সম্বল হারিয়ে ওই প্রবাসী নারী এখন সামাজিকভাবে চরম বিপর্যস্ত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি লোকটাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিলাম। একটা সুন্দর সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমার জীবনের সব সঞ্চয়, বিদেশে বসে করা অমানবিক পরিশ্রমের টাকা সবকিছু তার হাতে তুলে দিয়েছি। এখন আমি শুধু বিচার চাই, আমার কষ্টের টাকা ফেরত চাই এবং এই ভয়ংকর প্রতারণার একটি সুষ্ঠু তদন্ত চাই। নিজের অধিকার আদায় করতে ভুক্তভোগী এই নারী ইতিমধ্যে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত মুনসুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে দুটি আলাদা মামলা দায়ের করেছেন, যে মামলাগুলো বর্তমানে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
একজন স্কুলশিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁর কাছে সমাজের মানুষ নীতি ও আদর্শ শেখে। সেই মহান পেশার একজন মানুষের বিরুদ্ধে এমন ভয়াবহ প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় পুরো বাগমারা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড় সব জায়গায় এখন এই ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। সমাজের সচেতন মানুষ ও স্থানীয় এলাকাবাসী মনে করেন, এমন ঘটনা পুরো শিক্ষক সমাজের জন্যই লজ্জার। তাঁরা এই ঘটনার দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষক মুনসুর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সাংবাদিকের পরিচয় পেয়ে এবং অভিযোগের বিষয়টি শোনার পরপরই তিনি কোনো ধরনের মন্তব্য না করে তড়িঘড়ি করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।














