সচিবালয়ের মতো কঠোর নিরাপত্তার জায়গায় চুরির ঘটনা খোদ প্রশাসনকেই অবাক করেছে। তাও আবার যে সে তার নয়, চুরি গেছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতি গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ‘লাল টেলিফোন’ সংযোগের তামার তার। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগের এই তার চুরির মামলায় জড়িত দুজনকে শেষ পর্যন্ত রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। অভিযুক্তরা হলেন সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্র (২৬) ও ভাঙারি ব্যবসায়ী রিজাকুল ইসলাম (৩২)। আজ শুক্রবার শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক বা এসআই শাহ আলম গণমাধ্যমের কাছে আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) এসআই ইনজামুল হক এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পালন করছেন। আজ শুক্রবার তিনি দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে তাদের ৭ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান। বিচারক পুরো বিষয়টি বিস্তারিত শুনে আসামিদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এদিন আদালতে আসামিদের পক্ষে কথা বলার জন্য কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
এই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিদ হায়দার বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সচিবালয়ের পুরোনো এক নম্বর ভবন থেকে নতুন এক নম্বর ভবন পর্যন্ত টেলিযোগাযোগের একটি মোটা কপার কেবল বা তামার তার টানা ছিল। মূলত এই কেবলের মাধ্যমেই সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাল টেলিফোন নম্বরগুলো সচল রাখা হতো। লাল টেলিফোন রাষ্ট্রের অতি জরুরি ও গোপনীয় আলাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। দুর্বৃত্তরা ভবনের ছাদ থেকে এই কপার কেবল কেটে ফেলায় গুরুত্বপূর্ণ সব টেলিফোন সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এমন একটি স্পর্শকাতর ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত তদন্তে নামে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিটিটিসি গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ের ওই আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্রকে আটক করে। তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে চুরির কথা অকপটে স্বীকার করে নেয়। রঞ্জন পুলিশকে জানায়, গত ২২ মে সে অত্যন্ত সুকৌশলে ছাদ থেকে এই তামার তার কেটে চুরি করে।
চুরি করার পর রঞ্জন তারগুলো বিক্রির ফন্দি আঁটে। গত ১ জুন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হলের সামনে একটি ভাঙারি দোকানে গিয়ে সেই তারগুলো বিক্রি করে দেয়। রঞ্জন এই মূল্যবান তামার তারগুলো প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে। সে ওই ভাঙারি দোকানে মোট ৮ কেজি ২০০ গ্রাম তার বিক্রি করে সামান্য কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন কেটে সে মাত্র কয়েক হাজার টাকার লোভে এই কাজ করেছে, যা তদন্ত কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে।
রঞ্জনের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসির একটি চৌকস দল দ্রুত অভিযানে নামে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে হল-সংলগ্ন ওই ভাঙারি দোকান থেকে ব্যবসায়ী রিজাকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। পরে রিজাকুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চকবাজার থানার হোসেনি দালান রোড এলাকার একটি ভাঙারি গুদামে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সেখান থেকে অবশেষে চুরি হওয়া তারগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সিটিটিসি।
সচিবালয়ের মতো একটি সুরক্ষিত জায়গায় একজন সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মীর এমন কাণ্ড দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ফাঁকফোকর নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তামার বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম অনেক সময় টনপ্রতি ৯,০০০থেকে১০,০০০
ছুঁয়ে যায়। তামার দাম মাঝে মাঝেই ১০% থেকে ১৫% ওঠানামা করে, যার ফলে স্থানীয় চোরদের কাছেও তামার তার চুরি করা খুব আকর্ষণীয় একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সামান্য কিছু টাকার লোভে তারা যে রাষ্ট্রের প্রায় ১০০% গোপনীয় একটি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।
রিমান্ডে নেওয়ার পর পুলিশ এখন জানার চেষ্টা করছে, এই চুরির পেছনে অন্য কোনো বড় চক্র বা অন্তর্ঘাতমূলক কোনো উদ্দেশ্য জড়িত আছে কি না। নাকি এটি নিছকই কিছু টাকার লোভে করা একটি সাধারণ চুরি। রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ভবনে এমন চুরির ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে আর না ঘটে, সে জন্য সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কথা ভাবছে প্রশাসন। আগামী ৫ দিনের পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে এই চুরির ঘটনার আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।














