বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। একসময় এই ব্যাংকটি সাধারণ মানুষের আস্থার অন্যতম প্রধান প্রতীক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির চরম আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বিপুল অর্থ লুটপাটের খবরে দেশজুড়ে গ্রাহকদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা কালীগঞ্জ। এখানকার অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। নিজেদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা নিরাপদে ফিরে পাওয়ার দাবিতে এবং অবৈধ চেয়ারম্যানের অপসারণ চেয়ে এবার রাজপথে নেমেছেন কালীগঞ্জ উপজেলার সাধারণ গ্রাহকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার, ৪ জুন সকালে কালীগঞ্জ শহরের ইসলামী ব্যাংক শাখা কার্যালয়ের সামনে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শত শত গ্রাহকের চোখেমুখে ছিল চরম হতাশা, ক্ষোভ ও ভয়ের ছাপ। তাদের মূল দাবিগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও সময়োপযোগী। বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা অবিলম্বে ব্যাংকের বর্তমান অবৈধ চেয়ারম্যানের পদত্যাগ ও অপসারণ দাবি করেন। একই সঙ্গে তারা গ্রাহকদের আমানতের ১০০% সুরক্ষা নিশ্চিত করা, এস আলম গ্রুপ ও তাদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী দোসরদের ব্যাংক থেকে বয়কট করার ডাক দেন। এছাড়া সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের অধিকার ও জমানো টাকা চাইতে গিয়ে নিরীহ গ্রাহকদের ওপর যে নির্মম পুলিশি হামলা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তারা। রোদ ও গরম উপেক্ষা করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
গত কয়েক বছরে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এই পাচার করা টাকার পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার ($) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের কারণে ব্যাংকটিতে বর্তমানে চরম তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রাহকরা তাদের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে চেক বা এটিএম বুথ থেকে বারবার খালি হাতে ফিরে আসছেন। অনেকে মেয়ের বিয়ে, জরুরি চিকিৎসার খরচ বা হজে যাওয়ার জন্য তিল তিল করে টাকা জমিয়েছিলেন। এখন বিপদের দিনে সেই টাকা তুলতে না পেরে তারা রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
মানববন্ধনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও আবেগী বক্তব্য রাখেন ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক শফিউদ্দিন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ব্যাংক। প্রবাসীদের পাঠানো রক্তঘাম করা রেমিট্যান্স এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকায় এই ব্যাংক এত বড় হয়েছে। কিন্তু একটি লুটেরা চক্র ব্যাংকটিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। আমরা আমাদের আমানতের নিরাপত্তা ও গ্যারান্টি চাই। ব্যাংক খাতে যে নজিরবিহীন অনিয়ম ও বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক জাকারিয়া এবং আব্দুল মমিনও একই সুরে কথা বলেন। তারা দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় দৈনিক নবচিত্র পত্রিকার প্রধান সম্পাদক আলহাজ্ব শহিদুল ইসলাম। তিনি তার জোরালো বক্তব্যে বলেন, গ্রাহকরা যখন তাদের নিজেদের জমানো টাকা নিয়ে চিন্তিত হয়ে রাস্তায় নামেন, তখন তাদের আশ্বস্ত না করে উল্টো তাদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া চরম অমানবিক একটি কাজ। আমরা এই ন্যাক্কারজনক পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। ব্যাংকগুলোকে যেকোনো মূল্যে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। যারা ব্যাংক লুটের সাথে সরাসরি জড়িত, তাদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। মানুষ ব্যাংকের ওপর আস্থা হারালে দেশের পুরো অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
এই মানববন্ধনে বিভিন্ন বয়সের নারীদের উপস্থিতিও ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। নুরজাহান বেগম, রহিমা খাতুন এবং শিরিন শবনমের মতো সাধারণ গৃহিণীরাও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রহিমা খাতুন বলেন, আমরা সংসারের দৈনন্দিন খরচ বাঁচিয়ে, নিজেদের অনেক ব্যক্তিগত শখ বিসর্জন দিয়ে ভবিষ্যতের আশায় ব্যাংকে টাকা জমিয়েছিলাম। এখন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি, দেশের মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯% থেকে ১০% এর ঘরে ওঠানামা করছে। এই কঠিন দুর্দিনে আমরা যদি আমাদের জমানো ২,০০০বা৫,০০০ডলার সমমূল্যের দেশীয় টাকাও তুলতে না পারি, তাহলে আমাদের পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। নারীদের এই কান্না আর ক্ষোভ প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ কতটা অসহায় বোধ করছেন।
ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ এবং এস আলম গ্রুপের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের ওপর সাধারণ গ্রাহকদের আর বিন্দুমাত্র কোনো আস্থা অবশিষ্ট নেই। বিক্ষোভকারীরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যদি তাদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেওয়া না হয় এবং গ্রাহকদের জমানো টাকা তোলার সীমা পুরোপুরি স্বাভাবিক করা না হয়, তবে তারা আরও বড় ও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন। কালীগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার গ্রাহক এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। তাদের একটাই দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যেন এখনই এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো আইনি বা নৈতিক অধিকার কারও নেই।














