ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলায় মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে পুলিশ দারুণ এক সাফল্য দেখিয়েছে। বুধবার উপজেলার খলুমবাড়ীয়া বাজার সংলগ্ন তিন রাস্তার মোড় এলাকা থেকে পুলিশ এই দুই ব্যক্তিকে পাকড়াও করে। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে এমন মরণনেশার ব্যবসা যারা করে, তাদের এই আটকের খবরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে এখন ব্যাপক স্বস্তি বিরাজ করছে।
ঘটনার দিন শৈলকূপা থানা পুলিশ গোপন ও নির্ভরযোগ্য একটি সংবাদ পায় যে, খলুমবাড়ীয়া বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে কয়েকজন মাদক কারবারি ইয়াবা কেনাবেচার জন্য অপেক্ষা করছে। এই খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ একটুও সময় নষ্ট না করে দ্রুত ওই এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজন ওই দুই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের অত্যন্ত চৌকস একটি দল অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাদের শরীর তল্লাশি করে একেবারে হাতেনাতে ২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে।
গ্রেফতার হওয়া দুই মাদক ব্যবসায়ীর পরিচয় পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এদের মধ্যে একজন হলেন শৈলকূপা উপজেলার সারুটিয়া গ্রামের মৃত ইসমাইল শেখের ছেলে মো. আখতার শেখ। তার বয়স প্রায় ৬০ বছর। অন্যজন হলেন হাকিমপুর গ্রামের মো. রেজাউল জোয়ারদারের ছেলে মো. হাফিজুর জোয়ারদার, যার বয়স ৩০ বছর। বয়সের এত বিশাল পার্থক্য থাকার পরও তারা দুজন মিলে অত্যন্ত গোপনে এই অবৈধ মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছিল। ৬০ বছর বয়সী একজন বয়স্ক মানুষ যখন এমন জঘন্য মরণনেশা বিক্রির সাথে সরাসরি যুক্ত হন, তখন আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের করুণ চিত্রটি খুব সহজেই সবার সামনে ফুটে ওঠে। অপরাধীরা অনেক সময় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে বয়স্ক মানুষদের ব্যবহার করে, কারণ সাধারণ মানুষ তাদের সহজে সন্দেহ করে না।
বর্তমানে আমাদের দেশে ইয়াবা একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ এই মাদকের ছোবলে নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নষ্ট করছে। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যমতে, দেশের যুবসমাজের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% মানুষ নানাভাবে এই মাদকের কারণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবৈধ এই মাদক ব্যবসার কারণে দেশ থেকে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। চোরাকারবারিরা মিয়ানমার ও অন্যান্য সীমান্ত দিয়ে এই মরণনেশা দেশে ঢোকাচ্ছে। প্রতিটি ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রির মাধ্যমে এই কারবারিরা যুবসমাজের অমূল্য জীবন ধ্বংস করে নিজেদের পকেট ভারী করছে।
মাদকের কারণে শুধু যে একজন ব্যক্তি নষ্ট হয় তা নয়, বরং একটি সাজানো গোছানো পরিবারও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। যারা নিয়মিত ইয়াবা সেবন করে, তারা মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি বা খুনের মতো ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, গ্রামগঞ্জে ঘটা বিভিন্ন অপরাধের প্রায় ৮০% ঘটনার পেছনেই থাকে এই মাদকের মারাত্মক প্রভাব। নেশায় আসক্ত সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবা-মায়েরা সব সময় এক অজানা আতঙ্কে দিন কাটান। অনেক সময় পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের সুস্থ জীবনে ফেরাতে রিহ্যাব সেন্টারে ৫০০থেকেশুরুকরে১০০০ ডলারের সমপরিমাণ দেশীয় টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়, যা অনেক গরিব পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা একেবারেই অসম্ভব।
এই সফল অভিযানের বিষয়ে শৈলকূপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কোবির মোল্লা স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, পুলিশ আটক দুই মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া খুব দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। পুলিশ এই আসামিদের আদালতে তুলে রিমান্ড চাইবে, যাতে এই ছোট কারবারিদের পেছনের মূল হোতাদের নামও দ্রুত বেরিয়ে আসে। ওসি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন, মাদক কারবারিরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন, পুলিশ তাদের কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না।
মাদকের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অভিযান আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে শুধু পুলিশ দিয়ে এই বিশাল মাদক সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করা কখনোই সম্ভব নয়। সমাজ থেকে মাদক চিরতরে দূর করতে হলে প্রতিটি পরিবারের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এলাকার তরুণ সমাজকে বেশি করে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। বাবা-মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তান কার সাথে মিশছে বা কোথায় সময় কাটাচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমেই শৈলকূপাসহ পুরো বাংলাদেশকে একটি সুস্থ, সুন্দর ও মাদকমুক্ত সমাজ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।














