৯১ বছর বয়স, জীবন-সায়াহ্নে এসেও কোনো সরকারি ভাতার দেখা পাননি লতিফুন নেসা। বয়সের ভারে চলাফেরার শক্তি হারিয়েছেন, লাঠিই এখন একমাত্র ভরসা। স্বামী হারিয়েছেন প্রায় তিন দশক আগে, তারপর থেকে পক্ষাঘাত ও অন্যান্য রোগে ভুগে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বিধবা, বয়স্ক কিংবা প্রতিবন্ধী ভাতা এসবের যে কোনোটির যোগ্য তিনি। কিন্তু ৯১ বছরেও কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের রুদ্রপুর বিশ্বাসপাড়ার এই বৃদ্ধার ভাগ্যে জোটেনি কোনো সরকারি ভাতার কার্ড। এই ঘটনা এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
লতিফুন নেসা দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ের মা। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি দুই ছেলের কাছেই আছেন। তবে ছেলেরাও বয়সের ভারে এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে তার ঠিকমতো দেখাশোনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বড় ছেলে কাশেম বিশ্বাস, যার বয়স ৭০ বছর, নিজেও নানা শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। ছোট ছেলে আব্দুল খালেক বিশ্বাস (৬৫) শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। দুই ভাইয়ের টানাটানির সংসারে মায়ের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর সম্প্রতি পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার পর লতিফুন নেসার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। চিকিৎসার জন্য অর্থের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় আক্ষেপ করে লতিফুন নেসা বলেন, “ভাতার টাকা পেলে নিজের ইচ্ছামতো কিছু কিনে খেতে পারতাম। নাতি-নাতনিদেরও কিছু দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু টাকা না থাকলে কিভাবে দেব? তাই আমার ভাতার খুব দরকার।” তার পুত্রবধূ শেফালী খাতুন জানান, শাশুড়ির খাবারের ব্যবস্থা কোনো রকমে করতে পারলেও ওষুধ ও অন্যান্য খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সরকারি ভাতা পেলে তাদের একটু স্বস্তি হতো।
প্রতিবেশী আব্দুল মজিদ জানান, ভাতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে ঘুরেছেন লতিফুন নেসা। ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিয়েছেন একাধিকবার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। “একজন ৯১ বছর বয়সী বিধবা নারী বয়স্ক ও বিধবা ভাতার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনো সুবিধা পেলেন না, সেটি বড় প্রশ্ন,” বলেন তিনি।
এ বিষয়ে দোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগের তালিকায় লতিফুন নেসার নাম ছিল না। তবে ১৫ দিন আগে তৈরি করা নতুন তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি জানান, ইউনিয়নে শত শত আবেদনকারীর কারণে হয়তো আগে তার নাম নজরে আসেনি, তবে এখন বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজ দীপা রানী সরকার আশ্বাস দিয়েছেন যে, লতিফুন নেসার ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, অনলাইনে নিবন্ধনের কাগজপত্র পাওয়ার পর তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন এবং তাকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
লতিফুন নেসার মতো অনেকেই সরকারি ভাতার জন্য বছরের পর বছর ঘুরেও সুবিধা পাচ্ছেন না। এই ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কত দ্রুত রূপ নেয় এবং লতিফুন নেসা তার প্রাপ্য অধিকারটুকু কবে বুঝে পান।














