বদলি ঠেকাতে ঢাকায় পড়ে আছেন সাবেক কর্মকর্তা, কোটচাঁদপুর হাসপাতালে দেড় মাস ধরে আর্থিক অচলাবস্থা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন এক অদ্ভুত এবং চরম হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরকারি নিয়মে বদলির আদেশ পাওয়ার পরও পুরনো এক কর্মকর্তা নিজের চেয়ার কোনোভাবেই ছাড়তে রাজি নন। নিজের বদলি ঠেকাতে তিনি গত প্রায় দেড় মাস ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নতুন এক কর্মকর্তা এসে যোগ দিলেও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বুঝে না পাওয়ায় তিনি কার্যত হাত গুটিয়ে বসে আছেন। এর ফলে পুরো হাসপাতালের আর্থিক কার্যক্রম প্রায় ১০০% অচল হয়ে পড়েছে। এমন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে হাসপাতালের সেবার মান কমছে, যার চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সাধারণ গরিব রোগীদের।

হাসপাতাল প্রশাসন ও স্থানীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, গত ২১ এপ্রিল কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আল মামুনের বদলির আদেশ জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী বদলির আদেশ পাওয়ার পরপরই নতুন কারও কাছে তার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেওয়ার কথা। ওই আদেশের পর নতুন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে ডা. এম আশরাফুল আলম ওই হাসপাতালে যোগদানও করেন। কিন্তু দেড় মাস পার হয়ে গেলেও সাবেক কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কর্মকর্তার কাছে কোনো দায়িত্ব ও আর্থিক ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি। ফলে নতুন কর্মকর্তা চাইলেও নিজের দাপ্তরিক কাজ শুরু করতে পারছেন না।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

দায়িত্ব হস্তান্তর না করার ফলে হাসপাতালের দৈনন্দিন আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেকোনো সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিনের খরচ, ভর্তি থাকা রোগীদের খাবার, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার জন্য নিয়মিত আর্থিক অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন-ভাতা, যাতায়াত বিল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিল পরিশোধের কাজ পুরোপুরি আটকে আছে। প্রতি মাসে এই হাসপাতালে হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটার বিল তৈরি হয়। কিন্তু পুরনো কর্মকর্তার স্বাক্ষরের অভাবে সব বিল-ভাউচার ও প্রশাসনিক অনুমোদনের ফাইল এখন টেবিলে ধুলো খাচ্ছে। ঠিকাদাররা টাকা না পেয়ে নতুন করে হাসপাতালে সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, গত ২১ এপ্রিল বদলির আদেশের খবর পাওয়ার পর থেকেই ডা. আমানুল্লাহ আল মামুন আর কর্মস্থলে আসেননি। তিনি তার এই বদলি ঠেকাতে এবং বর্তমান পদেই যেকোনো মূল্যে বহাল থাকতে ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। একজন প্রথম শ্রেণির দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন স্বেচ্ছাচারী আচরণে খোদ হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসক ও নার্সরা বেশ ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। এ বিষয়ে আসল ঘটনা এবং তার অবস্থান জানার জন্য ডা. আমানুল্লাহ আল মামুনের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার দিক থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী তীব্র হতাশা প্রকাশ করে জানান, নতুন কর্মকর্তা তো ঠিকই প্রতিদিন হাসপাতালে আসছেন এবং নিজের অফিসে বসছেন। কিন্তু তার হাতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা আর্থিক ক্ষমতা নেই। তিনি চাইলেও রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত বা ফান্ড ছাড় করার নির্দেশ দিতে পারছেন না। অন্যদিকে বদলি হওয়া কর্মকর্তা ঢাকায় বসে থাকায় অফিসের দৈনন্দিন কাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে হাসপাতালে তুলা, স্যালাইন বা লাইফ সেভিং ড্রাগসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় মেডিকেল সরঞ্জামের প্রায় ৫০% থেকে ৮০% ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তখন ভর্তি থাকা মুমূর্ষু রোগীদের বাইরে থেকে চড়া দামে এসব জিনিস কিনে আনতে হবে।

সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আল মামুন অন্য জায়গায় বসে ওটিপি (OTP) বা মোবাইল ফোনের ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে কিছু আর্থিক কাজ সারছেন, যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। এ বিষয়ে নতুন যোগদানকারী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এম আশরাফুল আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বেশ অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করায় যে আমার খুব ব্যক্তিগত সমস্যা হচ্ছে তা নয়, তবে সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ওটিপির মাধ্যমে অন্য কর্মস্থল থেকে কিছু সমস্যার সমাধান করছেন। দৈনন্দিন আর্থিক কাজের সমাধান কীভাবে হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কী আর বলব, ক্ষমতা বুঝে না পাওয়ায় দাপ্তরিক কাজে কিছুটা সমস্যা তো হচ্ছেই।

টানা দেড় মাসেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করার এই অদ্ভুত ও নজিরবিহীন ঘটনা কোটচাঁদপুর উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এই এলাকার প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ও একমাত্র ভরসাস্থল। প্রতিদিন এখানে শত শত গরিব ও অসহায় মানুষ একটু ভালো সেবা পাওয়ার আশায় ছুটে আসেন। স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এমন প্রশাসনিক অচলাবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। দ্রুত এই আর্থিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ