দীর্ঘ ১২ বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি আর স্বপ্ন পূরণের কঠিন লড়াই শেষে যখন কোনো শিক্ষার্থী দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে ভর্তির সুযোগ পায়, তখন তার ও তার পরিবারের আনন্দের কোনো সীমা থাকে না। এই আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং মেধাবীদের আরও বহুগুণ উৎসাহিত করতে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় এক চমৎকার উদ্যোগ নিয়েছে ‘দ্যা ড্রিমার্স’। এটি মূলত এলাকার তরুণদের পরিচালিত একটি শিক্ষার্থী ও সামাজিক কল্যাণমূলক সংগঠন। গত রবিবার, ৩১ মে তারা উপজেলার কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মান জানাতে আয়োজন করে ‘দ্যা ড্রিমার্স এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা সেসব অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা দেয়, যারা নিজেদের মেধা ও ঘামে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও প্রথম সারির ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা মানেই এক বিশাল যুদ্ধ। পরিসংখ্যান বলে, প্রতি বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ৫% থেকে ৭% শিক্ষার্থী নিজেদের কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়। এমন তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে মহেশপুর উপজেলার যেসব মুখ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছে, তাদের হাতেই মূলত এই সম্মাননা ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট তুলে দেয় দ্যা ড্রিমার্স। রবিবার সকালে মহেশপুর উপজেলা মডেল মসজিদের সুসজ্জিত সেমিনার রুমে এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সকাল থেকেই কৃতি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের পদচারণায় পুরো এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে।
এই জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের মনে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগান ঝিনাইদহ-০৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। তিনি নিজ হাতে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রেস্ট ও সনদ বিতরণ করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতে জায়গা করে নেওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। তিনি কৃতি শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করেন, তারা যেন পড়াশোনা শেষ করে বড় কর্মকর্তা, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর নিজেদের শেকড়কে ভুলে না যায়। এলাকার সাধারণ মানুষের সেবায় যেন তারা সব সময় নিজেদের নিয়োজিত রাখে। প্রধান অতিথি ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপজেলার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং কৃতি শিক্ষার্থীদের গর্বিত অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন।
সন্তানের এমন অভাবনীয় সাফল্যে অনুষ্ঠানে আসা অনেক বাবা-মায়ের চোখেই তখন ছিল আনন্দের অশ্রু। গ্রামের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে শহরে পাঠিয়ে কোচিং করানো এবং ভর্তি পরীক্ষার ফরম তোলার পেছনে অনেক পরিবারের প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। অনেক কৃষক বা দিনমজুর বাবা ঋণ করে এই টাকা জোগান দেন। তাই সন্তানের সাফল্যের দিনটিতে এমন সম্মাননা পেয়ে অভিভাবকরা আয়োজকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আলোচনা পর্বে এসে আমন্ত্রিত অতিথিরা দ্যা ড্রিমার্সের এমন শিক্ষার্থীবান্ধব ও মানবিক উদ্যোগের মন খুলে প্রশংসা করেন। তারা বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণরা যখন মোবাইল ফোন আর নানা নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ছে, তখন দ্যা ড্রিমার্সের মতো সংগঠনগুলো সমাজে সত্যিকারের আলো ছড়াচ্ছে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের এই ধরনের সম্মাননা জানালে তারা ভবিষ্যতে দেশ ও দশের জন্য ভালো কিছু করতে ১০০% উৎসাহ পায়। বক্তারা সবাই একবাক্যে এই চমৎকার উদ্যোগকে সমাজের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে ড্রিমার্সের যেকোনো ইতিবাচক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আবেগময় পর্ব ছিল কৃতি শিক্ষার্থীদের নিজেদের সাফল্যের গল্প শোনানোর মুহূর্তটি। পুরস্কার হাতে নিয়ে শিক্ষার্থীরা একে একে মঞ্চে আসে এবং তাদের ভর্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোর কথা সবার সামনে তুলে ধরে। তারা জানায়, কীভাবে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা তারা পড়াশোনা করেছে, হতাশা এলে কীভাবে শিক্ষকরা তাদের সাহস জুগিয়েছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুনিয়র বা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইবোনদের জন্য তারা বেশ কিছু মূল্যবান পরামর্শ দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অযথা সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় পুরো মনোযোগ দেওয়ার জন্য তারা জুনিয়রদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানায়।
আয়োজক সংগঠন দ্যা ড্রিমার্সের সদস্যরা জানান, তারা শুধু এক দিনের সংবর্ধনা দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চান না। বরং যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে মাঝপথে হোঁচট খায়, তাদের পাশেও ছায়ার মতো দাঁড়াতে চায় এই সংগঠন। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মহেশপুর উপজেলাকে একটি শতভাগ শিক্ষিত ও আলোকিত জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা। এই তরুণ উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন, মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও পরিচর্যা করতে পারলে গ্রাম থেকেই বিশ্বমানের পেশাজীবী ও গবেষক তৈরি করা সম্ভব।
দিনব্যাপী এই চমৎকার আয়োজনের একেবারে শেষ ভাগে এসে পুরো সেমিনার রুমে এক অদ্ভুত আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার পরিবেশ তৈরি হয়। সবাই মিলে একটি সুন্দর ফটোসেশনে অংশ নেন এবং অভিভাবকরা হাসিমুখে সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফেরেন। দ্যা ড্রিমার্সের এই ‘এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড’ মহেশপুরের তরুণ প্রজন্মের মনে একটি বড় দাগ কেটেছে। আজকের এই সম্মাননা দেখে এলাকার স্কুল-কলেজের অন্য শিক্ষার্থীরাও আগামী দিনে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠে নিজেদের জায়গা করে নিতে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।














