বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হলো ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ। এই দলের রাজনীতিতে ফেরা বা না ফেরা নিয়ে দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম মনে করেন, আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বর্তমানে মাঠে যা ঘটছে, তার মূলে রয়েছে দেশের বড় দুই দলের চরম নিরাপত্তাহীনতাবোধ। আজ সোমবার নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এই নিরাপত্তাহীনতার পেছনের কারণ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।
মাহফুজ আলম তার পোস্টে পরিষ্কারভাবে জানান, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এখন যে রাজনৈতিক খেলা চলছে, তা আসলে বড় দুটি দলের ভেতরের ইনসিকিউরিটি বা নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি তার লেখায় প্রশ্ন রাখেন, ‘কৌন বনেগা লীগকা বাপ?’ অর্থাৎ কে এখন আওয়ামী লীগের শূন্য জায়গা দখল করবে বা তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে, তা নিয়ে এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৯৮৬ এবং ১৯৯৬ সালের তিক্ত রাজনৈতিক স্মৃতি এখনো ভুলতে পারছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভেতরে আদর্শিক শত্রুতা ও সংঘাতের ভয় কাজ করছে। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যখন যৌথভাবে জামায়াতের ওপর আক্রমণ করেছিল, সেই পুরনো স্মৃতিই মূলত তাদের এই ভয়ের প্রধান উৎস।
সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতি ঠিক কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তার একটি ভীতিজনক চিত্রও তিনি তরুণদের সামনে তুলে ধরেছেন। মাহফুজ আলম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আগামী দিনে বিএনপি যদি ক্ষমতায় বসে, তবে তারা নিজেদের সুবিধামতো বহুদলীয় গণতন্ত্র সাজিয়ে নেবে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী হয়তো রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে একদম চুপচাপ গুপ্ত অবস্থায় চলে যাবে। কিন্তু এতে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়বেন দেশের সেই সাহসী তরুণেরা, যারা জীবন বাজি রেখে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। দেশের প্রায় ৩০% তরুণ ভোটার এই গণ-অভ্যুত্থানে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমান জোটবদ্ধ রাজনীতির কারণে তরুণদের এই লড়াইয়ের আসল সুফল খুব একটা ঘরে ওঠেনি। ফ্যাসিবাদের পতনের পর দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বিনিয়োগ আনার যে স্বপ্ন তরুণরা দেখেছিল, তা বড়দের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে আটকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই অবস্থায় তিনি নিজের সহযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্মের কড়া সমালোচনা করতেও পিছপা হননি। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ করে লিখেছেন, অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের বর্তমান প্রজন্ম এখন নিজেদের হাতের তালুর চেয়েও ছোট একটি রুটি ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ, সামান্য পদ-পদবি বা ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। অথচ তাদের সামনে সুযোগ ছিল এই রুটিটাকে আরও অনেক বড় করার। তরুণদের উদ্দেশে তিনি জোরালো আহ্বান জানান, আপনারা নিজেদের ভেতরের আসল শক্তিটা বুঝুন। আপনাদের ক্ষমতা আছে এই পুরো জাতিকে এবং গ্লোবাল সাউথকে নেতৃত্ব দেওয়ার। সেই কাজটাই আপনাদের এখন করতে হবে।
ক্ষুদ্র স্বার্থের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পথও তিনি তরুণদের দেখিয়েছেন। মাহফুজ বলেন, যার যার পার্টি, সংগঠন, তরিকা বা ফেরকা থেকে সবাইকে এখন একজোট হয়ে সংগঠিত হতে হবে। সমাজে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে। শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে তরুণদের নিজেদের শক্ত প্রভাব তৈরি করতে হবে। আগামী ১০ বা ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে একটি মজবুত ঐক্যের পাটাতন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা তরুণদের কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন, তা নিয়েও তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, বড়রা এই প্রজন্মকে রীতিমতো হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। বড়দের মাত্রাতিরিক্ত আশকারা ও উসকানিতে তরুণদের অনেক মূল্যবান শক্তি অযথাই নষ্ট হয়েছে। এর সাথে ছোটদের কোন্দল ও একপাক্ষিক চিন্তাভাবনাও তরুণদের অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে। মাহফুজ আলম স্মরণ করিয়ে দেন, ঠিক এভাবেই ৭০ ও ৯০-এর দশকে তরুণদের স্বপ্ন ও শক্তিকে খেয়ে ফেলা হয়েছিল।
লড়াইটা যে একান্তই তরুণদের, এ কথা স্পষ্ট করে মাহফুজ আলম বলেন, আগের প্রজন্ম আপনাদের কোনোভাবেই বাঁচাতে আসবে না। এটা খুব সাধারণ একটি কথা। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আপনাদের কাজের ছক ও কৌশল ঠিক করতে হবে। নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুড়ি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষ ছড়ানো এখনই পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। মতাদর্শ নিয়ে তর্ক থাকবেই, তবে তরুণদের মূল লক্ষ্য বা কেবলা হতে হবে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ এবং ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা।
পোস্টের একেবারে শেষে ২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের এই রূপকার তরুণদের মনে সাহস জুগিয়ে বলেন, তরুণেরা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে। এখন সেই অসীম সাহসের সঙ্গে সাংগঠনিক শক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে। তরুণেরা যদি সজাগ থাকে, তবে দেশে ফ্যাসিবাদ আর কোনো রূপেই কখনো ফিরে আসতে পারবে না।














