চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ পাঁচজন শীর্ষ কর্মকর্তা মশা নিধনের ‘উদ্ভাবনী কার্যক্রম’ দেখতে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বিশাল এক পরিকল্পনা করেছিলেন। এই দলের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও শিকাগো। কিন্তু তাদের এই বিলাসবহুল বিদেশ সফরের পরিকল্পনায় সরাসরি জল ঢেলে দিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি এই সফর শুধু বাতিলই করেননি, বরং এমন একটি অদ্ভুত প্রস্তাবের কড়া সমালোচনাও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী খুব মজার ও চরম বাস্তবসম্মত একটি মন্তব্য করে বলেছেন, মশা মারা শেখার জন্য হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডায় যাওয়ার কোনো দরকার নেই। বরং দেশের ভেতরেই সন্ধ্যার পর যেকোনো নোংরা ডোবা বা নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে দু-তিন ঘণ্টা সময় কাটালে মশা নিধনের অনেক নতুন ও দেশীয় উদ্ভাবনী পদ্ধতি নিজেরাই বের করা সম্ভব!
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানিয়েছে। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদও সোমবার রাতে বিদেশ সফরের অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এই সফরের কোনো ছাড়পত্র বা সরকারি জিও (GO) পাওয়া যায়নি। তাই আপাতত তাদের এই আমেরিকান ড্রিম বা মশা নিধন শিখতে যাওয়ার মিশন পুরোপুরি স্থগিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, মশা নিধনের এই উদ্ভাবনী কার্যক্রম দেখতে প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো এবং ফ্লোরিডা রাজ্যে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে তাদের একটি আধুনিক কারখানা ও একটি উন্নত ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করার পরিকল্পনা ছিল। এই ভিআইপি দলে মেয়র শাহাদাত হোসেনের সাথে আরও যাদের যাওয়ার কথা ছিল তারা হলেন—ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম। এমনকি এই সফরের বৈধতা বাড়াতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকেও দলে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠান ‘ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস এলএলসি’ (Valent BioSciences LLC) এই পুরো সফরের অর্থায়ন বা যাবতীয় খরচের দায়িত্ব নিয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত জৈব কীটনাশক তৈরি করে থাকে। সফরের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় এমন বিভিন্ন অজুহাতে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ খোঁজেন। অনেক সময় দেখা যায় একটি সাধারণ বিদেশ সফরে জনপ্রতি অন্তত ১০ হাজার ডলার থেকে ২০ হাজার ডলার ($) বা ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো বিপুল অর্থ খরচ হয়। যদিও এই সফরের খরচ বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিচ্ছিল, তবে এর পেছনে ব্যবসায়িক কোনো স্বার্থ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন ওই সারসংক্ষেপ ফাইলটি দেখেন, তখন তিনি সরাসরি এই সফরের যৌক্তিকতা নাকচ করে দেন। তিনি ফাইলে একটি কড়া নির্দেশনা লিখে দেন। তাঁর মতে, আমাদের দেশের মশার ধরন ও পরিবেশ আর আমেরিকার ফ্লোরিডার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। তাই ওখানে গিয়ে মশা মারা শিখলে তা আমাদের দেশে খুব একটা কাজে আসবে না। বরং দেশের ডোবা-নালার পাশে দাঁড়িয়ে মশার উৎপত্তিস্থল ও স্বভাব পর্যবেক্ষণ করলে তা দিয়ে অনেক কার্যকর দেশীয় পদ্ধতি উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।
আমাদের দেশে মশা নিধন নিয়ে সিটি করপোরেশনগুলোর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বছর মশা মারার ওষুধ কেনা ও ছিটানোর জন্য সিটি করপোরেশনগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেরই একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা সম্প্রতি মশা নিধনের জন্য প্রায় পৌনে চার কোটি বা ৩.৭৫ কোটি টাকা খরচ করে ‘বিটিআই’ (বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস) নামের এক বিশেষ আধুনিক প্রযুক্তির কীটনাশক কিনেছেন। বর্তমানে এই ওষুধ শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিটিআই হলো এক ধরনের পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া, যা শুধু মশার লার্ভাকে মেরে ফেলে কিন্তু অন্য কোনো প্রাণী বা পরিবেশের ক্ষতি করে না। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন এত টাকা খরচ করে ওষুধ ছিটালেও মশার উপদ্রব খুব একটা কমছে না। অনেক সময় নিম্নমানের ওষুধ কেনা বা ঠিকমতো না ছিটানোর কারণে মশা আগের মতোই দাপিয়ে বেড়ায়। এমন পরিস্থিতিতে মশা মারার নাম করে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর এমন সময়োপযোগী ও সাহসী সিদ্ধান্ত তাই সাধারণ মানুষের মাঝে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সবাই আশা করছেন, এমন পদক্ষেপের কারণে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের অহেতুক বিদেশ ভ্রমণ অনেকখানি কমে আসবে।














