গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত বর্তমানে দেশে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গণমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। একটি ভবনের তিনটি স্তম্ভ যতই মজবুত হোক না কেন, চতুর্থ স্তম্ভটি নড়বড়ে হলে পুরো ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। ঠিক তেমনি, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র কখনোই পরিপূর্ণতা পায় না। গণমাধ্যম হলো সমাজের আয়না। এই আয়নার কাজ হলো সমাজের ভালো দিকগুলোর পাশাপাশি এর অসঙ্গতি, দুর্নীতি, আর সাধারণ মানুষের হাহাকারগুলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা।

কিন্তু আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন আমরা কোনো পত্রিকা পড়ি বা টেলিভিশনের পর্দায় খবর দেখি, তখন কি আমাদের মনে হয় যে এই আয়নাটি একদম পরিষ্কার? নাকি মনে হয় আয়নার ওপর এক অদৃশ্য ধুলোর আস্তরণ জমে আছে, যেখানে সত্যের প্রতিচ্ছবি অনেকটাই ঝাপসা? বর্তমানে আমাদের দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে, কিন্তু সেই সাথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সাধারণ মানুষের মনে প্রবলভাবে দানা বেঁধেছে—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত বর্তমানে দেশে? আমরা কি আসলেই আমাদের গণমাধ্যমগুলোতে সব সত্য নির্দ্বিধায় প্রকাশিত হতে দেখছি, নাকি নানা ধরনের আইনি ও মানসিক চাপে সাংবাদিকতার কলম আটকে যাচ্ছে? বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এই সংকট, এর পেছনের কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব নিয়ে আজ একটি বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

গণমাধ্যমের বর্তমান চালচিত্র ও বাস্তব অবস্থা

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমেই গণমাধ্যমের কাঠামোগত বিস্তারের দিকে তাকাতে হবে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে আমাদের গণমাধ্যম এখন সবচেয়ে স্বাধীন সময় পার করছে, কিন্তু ভেতরের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন।

সংখ্যার বিচারে গণমাধ্যমের অভাবনীয় বিকাশ

গত এক থেকে দেড় দশকে দেশে সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা অভাবনীয় মাত্রায় বেড়েছে। দেশে এখন তিন ডজনেরও বেশি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারে রয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রকাশিত হচ্ছে শত শত দৈনিক পত্রিকা। আর অনলাইন নিউজ পোর্টালের তো কোনো হিসাবই নেই; হাজার হাজার পোর্টাল এখন মানুষের হাতের মুঠোয় খবর পৌঁছে দিচ্ছে। সংখ্যার এই বিশালতা দেখলে যে কারও মনে হতে পারে, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক সুবর্ণ যুগ চলছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেই কি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়?

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

গুণগত মান ও স্বাধীনতার প্রশ্ন

বাস্তবতা হলো, সংখ্যার এই বিশালতার সাথে গুণগত মানের কোনো মিল নেই। এতগুলো টিভি চ্যানেল বা পত্রিকা থাকা সত্ত্বেও যখন দেশে বড় কোনো ঘটনা, দুর্নীতি বা অনিয়মের খবর প্রকাশ করার সময় আসে, তখন দেখা যায় বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম একই সুরে কথা বলছে অথবা নীরবতা পালন করছে। ভিন্নমত বা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা প্রকাশ করার সাহস খুব কম গণমাধ্যমই দেখাতে পারছে। অর্থাৎ, আমাদের দেশে গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সেই বিস্তারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে ভয়, চাপ আর আপসের সংস্কৃতি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পথে প্রধান অন্তরায়সমূহ

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে বহুমুখী আইনি, রাজনৈতিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা। বর্তমান সময়ে এই বাধাগুলো সাংবাদিকতাকে এক ধরনের অদৃশ্য শেকলে বেঁধে ফেলেছে।

আইনি খড়গ ও সাইবার নিরাপত্তা আইন

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ), যা বর্তমানে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ (সিএসএ) নামে পরিবর্তিত হয়েছে। নাম পরিবর্তন হলেও এই আইনের ভেতরে থাকা শাস্তির অনেক ধারা সাংবাদিকদের জন্য এক বিশাল ভয়ের কারণ। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সরকারি দলের নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা ঠুকে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যরাতে সাংবাদিকদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও আমরা দেখেছি। একটি সভ্য দেশে আইনি কাঠামো তৈরি করা হয় মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য, কিন্তু সেই আইন যখন সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সেলফ-সেন্সরশিপ বা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ

বর্তমানে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় এবং নীরব ঘাতক হলো ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’। এর মানে হলো, কেউ একজন সাংবাদিককে কোনো খবর ছাপতে নিষেধ করছে না, কিন্তু সাংবাদিক নিজেই ভয়ে সেই খবরটি লিখছেন না। একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক যখন দেখেন যে সত্য খবর প্রকাশ করলে তার চাকরি যেতে পারে, তার নামে মামলা হতে পারে বা তিনি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে পারেন, তখন তিনি বাধ্য হয়ে নিজের কলম থামিয়ে দেন। “কী দরকার ঝামেলায় জড়িয়ে?”—এই চিন্তা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক খবর পত্রিকার পাতা বা টিভির পর্দা পর্যন্ত পৌঁছায় না। সেলফ-সেন্সরশিপের এই অদৃশ্য দেয়াল আমাদের সাংবাদিকতাকে চরমভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

রাজনৈতিক ও করপোরেট প্রভাব

বর্তমানে আমাদের দেশের বড় বড় গণমাধ্যমগুলোর মালিক কারা? একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেল এবং জাতীয় দৈনিকের মালিকানার পেছনে রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো না কোনো করপোরেট ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। অনেক ব্যবসায়ী শুধু নিজেদের ব্যবসাকে সুরক্ষা দিতে, ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকার ঋণ নিতে বা সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করার জন্যই টিভি চ্যানেল বা পত্রিকা খোলেন। মালিকপক্ষের এই ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে সাংবাদিকরা অনেক সময়ই জিম্মি হয়ে পড়েন। মালিকের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো খবর ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কোনো সাংবাদিক চাইলেও প্রকাশ করতে পারেন না। ফলে গণমাধ্যম তার বস্তুনিষ্ঠতা হারায়।

সাংবাদিক নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতা

রাজধানীতে বসে সাংবাদিকতা করা আর মফস্বল বা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সাংবাদিকরা যখন স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী চেয়ারম্যান, এমপি বা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে খবর করেন, তখন তাদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিতে হয়। হাত-পা ভেঙে দেওয়া, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো বা এমনকি হত্যার মতো নির্মম ঘটনাও মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনে ঘটছে। এই হামলাগুলোর পর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

ডিজিটাল যুগে নতুন সংকট: গুজব বনাম সত্য

প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পুরো পৃথিবী একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ধারণাটিও কিছুটা পাল্টেছে এবং নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাপট

যখন মূলধারার গণমাধ্যমগুলো (পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল) সেলফ-সেন্সরশিপের কারণে সাধারণ মানুষের কথা বলতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ বাধ্য হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক বা ইউটিউবের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সাধারণ মানুষ এখন নাগরিক সাংবাদিকতার (Citizen Journalism) নামে নিজেদের চোখের সামনের ঘটনাগুলো লাইভ করে সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে ফেসবুকের খবর মানুষের কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে। এটি আমাদের প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলোর জন্য এক চরম লজ্জার এবং আস্থার সংকটের বিষয়।

সঠিক তথ্য যাচাইয়ের চ্যালেঞ্জ ও গুজব

সোশ্যাল মিডিয়ার একটি বড় সমস্যা হলো এখানে কোনো ‘গেটকিপার’ বা সম্পাদক নেই। যে কেউ চাইলেই যেকোনো তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে। অনেক সময় রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য বা সমাজে অস্থিরতা তৈরির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া খবর বা গুজব ছড়ানো হয়। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যদি স্বাধীনভাবে সবার আগে সত্য খবরটি প্রকাশ করতে পারত, তবে মানুষ আর গুজবে কান দিত না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ফলেই সমাজে অপতথ্য ও গুজবের দৌরাত্ম্য বাড়ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

গণতন্ত্র ও সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব

স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া একটি সমাজ কতটা অন্ধ হয়ে যেতে পারে, তা আমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারব।

প্রথমত, দুর্নীতি রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। যখন কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে আনে এই গণমাধ্যমই। সাংবাদিকরা যদি নির্ভয়ে এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে না পারেন, তবে লুটেরারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে গণমাধ্যম। সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক বা মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি বা বেকারত্বের হাহাকার যদি পত্রিকায় না ছাপা হয়, তবে নীতিনির্ধারকরা কখনোই দেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবেন না।

তৃতীয়ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ক্ষমতা মানুষকে অনেক সময় অন্ধ করে দেয়। স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারকে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তাকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে। তাই স্বাধীন গণমাধ্যম কখনোই সরকারের শত্রু নয়, বরং একটি সুন্দর রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম সহযোগী।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে করণীয়

গণমাধ্যমের এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু সাংবাদিকদের একার চেষ্টাই যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ যেসব আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা তৈরি করছে, সেগুলোর বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার আগে প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সেটি যাচাই-বাছাই করার আইনি বিধান তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের করপোরেট মালিকানার নীতিমালা নির্ধারণ করতে হবে। সংবাদকক্ষে মালিকপক্ষের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে সম্পাদকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী সঠিক বেতন-ভাতা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা কোনো অনৈতিক সুবিধা বা প্রলোভনের ফাঁদে পা না দেন।

তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের ওপর হওয়া সব ধরনের হামলা, নির্যাতন ও হত্যার বিচার দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। দেশে ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিলাসী দাবি নয়; এটি একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও বাসযোগ্য সমাজের মৌলিক শর্ত। বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ঠিক ততটাই সুরক্ষিত, যতটা একজন খাঁচায় বন্দি পাখির ওড়ার স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকে। চারদিকে শত শত গণমাধ্যমের চাকচিক্য থাকলেও, এর ভেতরে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং সত্য বলার সাহস ক্রমশই সংকুচিত হয়ে আসছে।

একটি আয়না যদি আমাদের মুখের কালো দাগটি দেখিয়ে দেয়, তবে আয়নাটি ভেঙে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং মুখের দাগটি পরিষ্কার করাই আসল সমাধান। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নীতিনির্ধারকদের এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে। ভয় দেখিয়ে বা আইন দিয়ে সাংবাদিকের কলম থামিয়ে সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের সুশাসন ও গণতন্ত্রকে চরম খাদের কিনারে ঠেলে দেয়।

সত্যকে তার আপন গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। গণমাধ্যম কর্মীরা যদি পেশাদারিত্ব বজায় রেখে, নির্ভয়ে এবং প্রভাবমুক্ত হয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারেন, তবেই দেশ দুর্নীতি ও অনিয়মের অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাবে। আমাদের প্রত্যাশা সব ধরনের অদৃশ্য শেকল ভেঙে বাংলাদেশের গণমাধ্যম একদিন সত্যিকার অর্থেই একটি স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।


সম্পর্কিত নিবন্ধ