ঝিনাইদহে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার আয়োজন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

খেলাধুলা মানুষের শরীর ও মন দুটোকেই সুস্থ রাখে। একটি সুস্থ ও সুন্দর জাতি গঠনে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত ও সুন্দর জেলা ঝিনাইদহ বরাবরই খেলাধুলার জন্য বেশ পরিচিত। একসময় এই জেলার মাঠে মাঠে তরুণদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যেত। ফুটবল, ক্রিকেট থেকে শুরু করে কাবাডি বা অ্যাথলেটিকসে ঝিনাইদহের খেলোয়াড়দের বেশ সুনাম ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোতে নানা কারণে সেই সোনালি অতীতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। তবে অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, সম্প্রতি ঝিনাইদহে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার জন্য বেশ কিছু চমৎকার আয়োজনের সূচনা হয়েছে। এই উদ্যোগগুলো জেলার ক্রীড়াপ্রেমী সাধারণ মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মের মনে নতুন করে আশার আলো জাগিয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, এই ধরনের আয়োজন ঝিনাইদহের ক্রীড়াঙ্গনকে আবারো তার হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করবে।

প্রতিভা অন্বেষণের গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

আমাদের দেশের আসল প্রতিভা লুকিয়ে আছে গ্রামের মেঠো পথ আর কাদামাটির মাঠে। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, শৈলকুপা, হরিণাকুন্ডু, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এমন অনেক কিশোর-তরুণ রয়েছে, যাদের পায়ে দারুণ ফুটবল স্কিল বা হাতে দুর্দান্ত বোলিং-ব্যাটিংয়ের জাদু রয়েছে। কিন্তু সঠিক সুযোগ ও প্ল্যাটফর্মের অভাবে এই প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা অনেক সময়ই হারিয়ে যায়। ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ বা প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই হলো এই লুকিয়ে থাকা রত্নগুলোকে খুঁজে বের করা। এই ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামের একজন সাধারণ ঘরের ছেলেও নিজের প্রতিভা সবার সামনে তুলে ধরার সুযোগ পায়। বর্তমানে ঝিনাইদহ জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগে বা বিভিন্ন ক্লাবের মাধ্যমে যে বাছাই প্রক্রিয়া চলছে, তা তৃণমূলের খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার একটি বড় সিঁড়ি হিসেবে কাজ করবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

তরুণ সমাজকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষার উপায়

বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো তরুণ প্রজন্মের বিপথগামী হওয়া। মাঠের অভাবে এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারে আমাদের কিশোর-তরুণরা এখন স্মার্টফোন, ভিডিও গেম এবং ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি কিশোর গ্যাং ও মাদকের মতো ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিও সমাজে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণদের এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে তাদের মাঠে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ঝিনাইদহে নতুন প্রতিভা অন্বেষণের এই আয়োজন তরুণদের মনে একটি লক্ষ্য তৈরি করে দিচ্ছে। তারা যখন দেখবে ভালো খেললে স্বীকৃতি পাওয়া যায় এবং বড় পর্যায়ে খেলার সুযোগ মেলে, তখন তারা নিজেরাই আড্ডা ও বাজে অভ্যাস ছেড়ে মাঠে সময় দেবে। এটি সমাজের জন্য এক বিশাল ইতিবাচক দিক।

তৃণমূল পর্যায়ে টুর্নামেন্ট ও প্রতিযোগিতার ভূমিকা

শুধু একদিনের বাছাই পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যিকারের প্রতিভা খুঁজে পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিভা অন্বেষণের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা অত্যন্ত জরুরি। আন্তঃস্কুল, আন্তঃকলেজ বা ইউনিয়ন ভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলো খেলোয়াড়দের নিজেদের প্রমাণ করার সবচেয়ে বড় জায়গা। ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামে এখন শীতকালে বা বর্ষায় ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব টুর্নামেন্ট দেখতে গ্রামের সাধারণ মানুষ ভিড় জমাচ্ছে, যা খেলোয়াড়দের দারুণভাবে উৎসাহিত করে। এই টুর্নামেন্টগুলো থেকেই বেরিয়ে আসবে আগামী দিনের বড় বড় তারকা খেলোয়াড়রা। তাই সারা বছর জুড়েই এমন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

আধুনিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা

প্রতিভা খুঁজে বের করাই কিন্তু শেষ কথা নয়, আসল কাজ শুরু হয় এরপর থেকে। একটি কাঁচা হিরেকে ঘষে মেজে চকচকে করতে যেমন দক্ষ কারিগরের প্রয়োজন হয়, তেমনি নতুন প্রতিভাকে জাতীয় মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন আধুনিক প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞ কোচ। ঝিনাইদহের বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্টেডিয়ামসহ উপজেলা পর্যায়ের মাঠগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নতুন খেলোয়াড়দের জন্য ভালো মানের বুট, ব্যাট, জার্সি এবং প্র্যাকটিসের পর্যাপ্ত সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচিত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করা গেলে তারা শারীরিকভাবে এবং কৌশলগত দিক দিয়ে আরও অনেক বেশি পরিপক্ব হয়ে উঠবে।

মেয়েদের অংশগ্রহণ ও ক্রীড়াঙ্গনে সমতা

খেলাধুলায় বাংলাদেশের মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। নারী ফুটবল বা ক্রিকেটে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। ঝিনাইদহে নতুন প্রতিভা খোঁজার এই আয়োজনে মেয়েদের অংশগ্রহণকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামের অনেক মেয়ের মধ্যেই দারুণ খেলাধুলার প্রতিভা রয়েছে, কিন্তু সামাজিক সংকোচ বা পরিবারের অমতের কারণে তারা মাঠে আসতে পারে না। মেয়েদের জন্য নিরাপদ মাঠ, আলাদা টুর্নামেন্ট এবং নারী কোচের ব্যবস্থা করা গেলে ঝিনাইদহ থেকেও অনেক ভালো নারী খেলোয়াড় উঠে আসবে। সমাজকে বোঝাতে হবে যে, ছেলে বা মেয়ে বিষয় নয়, মেধা থাকলে মেয়েরাও খেলাধুলায় সম্মানজনক ক্যারিয়ার গড়তে পারে।

প্রশাসন ও বিত্তবানদের পৃষ্ঠপোষকতার গুরুত্ব

খেলাধুলা এগিয়ে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন তা হলো আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা বা স্পন্সর। শুধু সরকারি বরাদ্দ দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের ব্যাপক উন্নয়ন করা সবসময় সম্ভব হয় না। ঝিনাইদহের নতুন প্রতিভাদের তুলে আনতে স্থানীয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। এর পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষ, ব্যবসায়ী মহল এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই মহতী উদ্যোগে স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে। তারা যদি নতুন খেলোয়াড়দের আর্থিক দায়িত্ব নেন বা টুর্নামেন্টগুলোতে সহযোগিতা করেন, তবে খেলোয়াড়রা নিশ্চিন্তে তাদের খেলায় মনোযোগ দিতে পারবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল একটি সমৃদ্ধ ক্রীড়াঙ্গন গড়ে তোলা সম্ভব।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ঝিনাইদহে ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার এই আয়োজন শুধু একটি সাধারণ ইভেন্ট নয়, এটি আগামী দিনের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বীজ বপন। আমাদের চারপাশে এমন অনেক প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, যারা একটুখানি পরিচর্যা ও সুযোগ পেলে পুরো দেশের নাম বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল করতে পারে। এই উদ্যোগ আমাদের তরুণ সমাজকে একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তবে এই আয়োজন যেন শুধু কয়েক দিনের উৎসবে পরিণত হয়ে থেমে না যায়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিভা অন্বেষণ থেকে শুরু করে তাদের জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। ঝিনাইদহের মাটি থেকে উঠে আসা এই নতুন প্রতিভারাই একদিন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেতৃত্ব দেবে, এটাই আমাদের সবার দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।


সম্পর্কিত নিবন্ধ