বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই এক অদ্ভুত উন্মাদনা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়, হাটে-মাঠে-ঘাটে সব জায়গায় আলোচনার বিষয় থাকে একটাই। প্রিয় দল জিতবে আর অধিনায়কের হাতে উঠবে সেই ঝলমলে সোনালি ট্রফি, এই স্বপ্ন দেখেন প্রতিটি ফুটবল ভক্ত। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলাটিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে বড় কোনো গৌরব আর নেই। আর এই গৌরবের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু আমরা বর্তমানে টিভির পর্দায় যে চমৎকার ট্রফিটি দেখি, ফুটবলের শুরুর দিকে কিন্তু এটি এমন ছিল না। প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফিটির নাম শুরুতে ছিল শুধু ‘ভিক্টরি’ বা ফরাসি ভাষায় ‘কুপ দ্য মন্ড’। পরে ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের অসামান্য অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই ট্রফির নতুন নাম রাখা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’।
ফরাসি ভাস্কর্যশিল্পী আবেল লাফ্ল্যর অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এই জুলে রিমে ট্রফিটি তৈরি করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’-এর আদলে তৈরি করা হয়েছিল এর মূল নকশা। ট্রফিটি তৈরি হয়েছিল খাঁটি রুপার ওপর চমৎকার সোনার প্রলেপ দিয়ে। আর এর নিচের অংশ বা ভিত্তিটি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান নীল পাথরের তৈরি, যাকে ল্যাপিস লাজুলি বলা হয়। এই ট্রফির ঐতিহাসিক মূল্য এতই বেশি ছিল যে, বর্তমান সময়ে নিলামে উঠলে এর দাম অনায়াসেই কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) ছাড়িয়ে যেত। পুরো ফুটবল বিশ্বের কাছে এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক পবিত্র প্রতীক।
সেই সময় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার একটি দারুণ নিয়ম ছিল। তারা ঘোষণা করেছিল, কোনো দেশ যদি তিনবার বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা জিততে পারে, তবে তারা এই আসল ট্রফিটি একেবারে চিরকালের জন্য নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ফুটবল জাদুকর পেলের জাদুতে ব্রাজিল ঠিক সেই কাজটিই করে দেখায়। পেলে, জাইরজিনহো, কার্লোস আলবার্তোদের নিয়ে গড়া সেই ব্রাজিল দলকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল চিরতরে জুলে রিমে ট্রফিটি নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়ার গৌরব অর্জন করে। ফিফাও তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং পরম শ্রদ্ধায় ট্রফিটি ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের (সিবিএফ) হাতে তুলে দেয়।
কিন্তু এই মহামূল্যবান ট্রফিটির ভাগ্যে এক চরম করুণ ও রহস্যময় পরিণতি লেখা ছিল। ১৯৮৩ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অবস্থিত ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের কড়া নিরাপত্তায় মোড়া সদর দপ্তর থেকে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। বুলেটপ্রুফ কাঁচের বক্স ভেঙে চোরেরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এটি নিয়ে যায়। এই চুরির ঘটনা পুরো ফুটবল বিশ্বকে ১০০% স্তব্ধ করে দেয়। চোরেরা কীভাবে এত নিরাপত্তা পেরিয়ে ট্রফিটি নিয়ে গেল, তা আজও এক বড় রহস্য হয়ে আছে। পুলিশের তদন্তকারীদের ধারণা, চোরেরা ট্রফিটি চুরি করার পর সেটি আগুনে গলিয়ে সোনার টুকরো হিসেবে কালো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছিল। বহু বছর ধরে অনেক তদন্ত চললেও এবং অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও আজ পর্যন্ত সেই আসল জুলে রিমে ট্রফি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিশ্ব হারিয়ে ফেলে তার ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান এক স্মারক।
এদিকে, ১৯৭০ সালে ব্রাজিল জুলে রিমে ট্রফিটি একেবারে নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়ার পর ফিফাকে বাধ্য হয়েই নতুন একটি ট্রফি বানানোর উদ্যোগ নিতে হয়। আর সেখান থেকেই ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে চালু হয় বর্তমানের ‘ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি’। নতুন এই ট্রফির ডিজাইনের জন্য পুরো বিশ্ব থেকে ৫৩টি দারুণ ডিজাইনের প্রস্তাব ফিফার কাছে জমা পড়েছিল। এর মধ্য থেকে ইতালীয় ভাস্কর্যশিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগার ডিজাইনটি ফিফা চূড়ান্তভাবে বেছে নেয়। তার হাতের নিখুঁত ছোঁয়ায় জন্ম নেয় ফুটবলের বর্তমানের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত এই সোনালি পুরস্কারটি।
নতুন এই ট্রফিটির গঠন ও জাদুকরি নকশা সবাইকে মুগ্ধ করে। এটি ১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি করা হয়। এর উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৬ দশমিক ১ কেজি। নকশায় খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, দুজন মানুষ তাদের দুই হাত দিয়ে পুরো পৃথিবীকে ওপরের দিকে তুলে ধরে আছেন। ভাস্কর গাজ্জানিগার মতে, এটি মূলত মানুষের চূড়ান্ত বিজয়, অসীম শক্তি এবং সারা বিশ্বের মানুষের ঐক্যের একটি অনন্য প্রতীক। বর্তমান বাজারে শুধু সোনা হিসেবে ওজন করে হিসাব করলেও এর দাম প্রায় আড়াই লাখ ডলার ($২৫০,০০০) এর বেশি হবে। তবে এর আসল সম্মান, আবেগ ও গৌরবের মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা একেবারেই অসম্ভব।
জুলে রিমে ট্রফি চুরির সেই ভয়ংকর ঘটনার পর ফিফা তাদের নিরাপত্তা নিয়মে অনেক বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এখনকার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল যতবারই বিশ্বকাপ জিতুক না কেন, তারা কখনোই এই আসল ট্রফিটি চিরতরে নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে না। বিশ্বকাপ ফাইনাল জয়ের পর মাঠে বাঁধভাঙা উদযাপনের জন্য আসল ট্রফিটি কিছুক্ষণ খেলোয়াড়দের হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে নিয়ে যাওয়ার সময় চ্যাম্পিয়ন দলকে আসল ট্রফির বদলে ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি চমৎকার রেপ্লিকা বা প্রতিরূপ দেওয়া হয়। আসল ট্রফিটি কড়া পাহারায় সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার নিজস্ব জাদুঘরে সযত্নে রাখা থাকে। এভাবেই বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পুরস্কারটি তার নিজের ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা ধরে রেখেছে।














