বুকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলেন আদরের মেয়েকে, জ্ঞান ফিরে জানলেন স্বামী-শ্বশুরসহ সেও আর নেই

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গা থেকে রাতের বেলা প্রাইভেট কারে করে বাড়ি ফিরছিলেন সাবরীনা জাহান শমী। চলন্ত গাড়িতে সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়ে সেহরিশকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে তিনি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এরপর আর কিছুই তাঁর মনে নেই। দুই দিন পর ঢাকার একটি হাসপাতালের বিছানায় যখন তাঁর জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি জানতে পারেন এক নিমিষেই তাঁর পুরো পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। বুকে জড়িয়ে রাখা ছোট্ট মেয়েটি, নিজের স্বামী এবং শ্বশুর—তিনজনই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এমন নির্মম বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শক্তি পৃথিবীর কোনো মানুষের থাকে না।

গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাত তিনটার দিকে যশোর-মাগুরা আঞ্চলিক মহাসড়কের গাইদঘাট এলাকায় এই ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটে। সাবরীনার স্বামী মাহমুদ হাসান জাকারিয়া গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। তিনি পেশায় একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। সামনের সিটে বসা ছিলেন সাবরীনার শ্বশুর আবদুল মজিদ সরদার, যিনি পল্লী বিদ্যুতের সাবেক পরিচালক ও ইটভাটার মালিক। আর গাড়ির পেছনের সিটে সাবরীনার সঙ্গে ছিল তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে সামিন আলমাস, ছোট্ট মেয়ে মাহাদিয়া হাসান সেহরিশ এবং শাশুড়ি মিনোয়ারা বেগম। চলন্ত গাড়িটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারের একটি বিশাল বটগাছে সজোরে ধাক্কা খায়। এতে পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে ৩ জনই চিরতরে বিদায় নেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

যাঁরা বেঁচে ফিরেছেন, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এখন চরম করুণ। সাবরীনার শাশুড়ির পায়ের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে গেছে। তাঁর পায়ে আগে থেকেই একটি চিকিৎসা ডিভাইস লাগানো ছিল, যা দুর্ঘটনার তীব্রতায় মাংস ভেদ করে বেরিয়ে আসে। সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে তাঁর বড় ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছে, তবে তিনি ভবিষ্যতে একা হাঁটতে পারবেন কি না, তা ১০০% অনিশ্চিত। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ বছরের ছেলে সামিনের হাত ও পা ভেঙেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এখন শিক্ষকেরা বাসায় এসে তাকে পড়াচ্ছেন। আর সাবরীনা নিজে বুকের খাঁচা এবং মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এই পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা এখন কে কার জন্য শোক করবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না। ছেলে সামিন প্রতিদিন তার বাবা, দাদা আর আদরের ছোট বোনের জন্য ডুকরে কাঁদে। সাবরীনার শাশুড়ি একসঙ্গে স্বামী, ছেলে আর নাতনিকে হারিয়ে প্রায় পাগল হয়ে গেছেন। জ্ঞান ফেরার পর সাবরীনা চিৎকার করে জানতে চেয়েছিলেন, ওরা কি সত্যি মারা গেছে? ওদের কি দাফন হয়ে গেছে? কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে তিন প্রজন্মের তিনজনকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে। দাদা আর বাবার মাঝখানের ছোট্ট কবরটি সেহরিশের।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

দুর্ঘটনার রাতের কিছু স্মৃতি এখনো সাবরীনাকে কুরে কুরে খায়। চুয়াডাঙ্গায় আত্মীয়ের বাড়িতে তাঁরা খুব আনন্দ করেছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে তাঁরা যশোরের উদ্দেশে রওনা দেন। সাবরীনা জানান, তাঁর স্বামী বেশ ভালো গাড়ি চালাতেন, তবে গত প্রায় দেড় বছর তিনি সেভাবে স্টিয়ারিং ধরেননি। রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার সাইনবোর্ড দেখে সাবরীনা তাঁকে সাবধানে চালাতে বলেছিলেন। পথে চা খাওয়ার জন্য গাড়ি থামিয়ে তাঁরা অনেক হাসাহাসিও করেন। ফেরার আগে আত্মীয়ের বাড়িতে সাবরীনার স্বামী নিজ হাতে বাবা, মা, স্ত্রী ও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে খাইয়েছিলেন। সচরাচর তিনি সবার সামনে এমন করতেন না। এখন মনে হয়, সেটাই ছিল তাঁর শেষ বিদায়।

২০১০ সালে সাবরীনার বিয়ে হয়। দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সাজানো একটি সুন্দর সংসার ছিল। স্বামীর পছন্দের রান্না করার জন্যই তিনি রান্নাবান্না শিখেছিলেন। এখন সেই সংসার ভেঙে চুরমার। বাসায় কাজের লোক থাকলেও রান্না করার আর কোনো উৎসাহ তাঁর নেই। স্বামী ও শ্বশুরের রেখে যাওয়া সম্পদের কারণে সাবরীনা ও তাঁর ছেলেকে হয়তো কোনো দিন আর্থিক কষ্টে পড়তে হবে না। জীবন চালাতে লাখ টাকা বা মিলিয়ন $ (ডলার) লাগুক না কেন, সেই সামর্থ্য তাঁদের আছে। কিন্তু সাবরীনা বলেন, তাঁর চারধারে সব থাকলেও শুধু আপন মানুষগুলোই নেই। এখন তাঁর জীবনে কোনো আনন্দ নেই, কোনো উৎসবের রং নেই।

দুর্ঘটনার পর ভয়াবহ সেই মুহূর্তে ছোট্ট ছেলে সামিনই সাহস করে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিয়েছিল। ছেলে মাকে জানিয়েছে, মারা যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বাবা পেছনের সিটে তাঁদের দিকে তাকানোর চেষ্টা করেছিলেন। সাবরীনা স্নাতকোত্তর শেষ করে লেখালেখি করতেন। অমর একুশে বইমেলায় তাঁর ৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। শ্বশুর তাঁর লেখার খুব প্রশংসা করতেন। সব হারিয়ে সাবরীনা এখন চরম শূন্যতায় ভুগছেন। তবে তিনি জানেন, বেঁচে থাকা ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও তাঁকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে, আবার জীবনের গল্প লিখতে হবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ