ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি সাধারণ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করে সারা দেশে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। চারদিকে যখন এই নিয়ে তুমুল সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তখন পরিস্থিতি শান্ত করতে তিনি নিজের সেই বিতর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। আজ শুক্রবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে তিনি এই কথা জানান। তিনি আশা করছেন, তাঁর এই বক্তব্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে চলমান সব বিতর্ক ও ভুল-বোঝাবুঝির চিরতরে অবসান ঘটবে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সম্প্রতি ‘SameerScane’ নামের একটি পডকাস্টে প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের পর। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পড়াশোনার মান ও গবেষণার অবস্থা নিয়ে কিছু কড়া মন্তব্য করেছিলেন। এরপরই গণমাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক পোস্টে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও বক্তব্যের ভুল উপস্থাপন প্রসঙ্গে’ শিরোনামে ববি হাজ্জাজ লেখেন, তাঁর ওই পডকাস্টের কিছু মন্তব্য নিয়ে মানুষ অযথাই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি মনে করেন, তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশ মানুষ সম্পূর্ণ ভুলভাবে বুঝেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মানুষ ইচ্ছা করেও ভুল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। তাই পুরো বিষয়টি সবার সামনে পরিষ্কার করা তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ববি হাজ্জাজ তাঁর পোস্টে একদম পরিষ্কার করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তা ১০০% তাঁর নিজের একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তা ও মতামত। এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা নীতির বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন, আমাদের এখন সময় এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও অনেক বেশি বিশ্বমানের একটি উন্নত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার। উন্নত বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার পেছনে প্রতিবছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করে। সেখানে আমাদের দেশে গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ অনেক সময় মোট বাজেটের মাত্র ১% থেকে ২% এর ঘরে আটকে থাকে। তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য কখনোই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি ঐতিহ্য, মর্যাদা বা জাতির প্রতি অবদানকে খাটো করা ছিল না। বরং তিনি এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর নিজের বড় স্বপ্নের কথাই সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

বিগত বছরগুলোতে দেশের উচ্চশিক্ষার যে বেহাল দশা হয়েছে, সেটিরও কড়া সমালোচনা করেন এই প্রতিমন্ত্রী। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, গত ১৭ বছরে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা খাত অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব একেবারেই দেওয়া হয়নি। বরং ভালো পড়াশোনা ও একাডেমিক উৎকর্ষের বদলে স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনা সব ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের পদোন্নতির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন নিয়ে বারবার বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে অন্যের গবেষণা চুরি বা প্লেজারিজমের মতো মারাত্মক অনৈতিক কাজের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। ববি হাজ্জাজ জানান, তিনি এসব খারাপ অভ্যাসের সব সময় কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি মন থেকে বিশ্বাস করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় এসব অনৈতিক কাজের কোনো স্থান থাকতে পারে না।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

পডকাস্টের ওই আলোচনাটি কেমন ছিল, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, সেই আলোচনাটি ছিল সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত একটি সাধারণ কথোপকথন। সেটি কোনো বড় গবেষণাভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক বা নীতিগত আলোচনা সভা ছিল না। যদি তিনি সত্যি সত্যি কোনো আনুষ্ঠানিক একাডেমিক বা নীতিগত আলোচনার মঞ্চে কথা বলতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তাঁর বক্তব্যের ভাষা ও উপস্থাপনা আরও সুন্দর ও নির্দিষ্ট করে সাজাতেন। তবে তিনি একটি বিষয়ে নিজের অবস্থান একেবারে স্পষ্ট করেছেন। আর সেটি হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এই দেশ ও জাতি গঠনে তার যে অসামান্য অবদান রয়েছে, তার প্রতি ববি হাজ্জাজের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি মন থেকে চান, এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হয়েই বসে না থাকুক, বরং বিশ্বমানের গবেষণা, নতুন উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার একটি স্বীকৃত জায়গা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করুক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতিও তিনি তাঁর আস্থা প্রকাশ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁরাও এই একই লক্ষ্য সামনে রেখে দিনরাত কাজ করছেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সবার সম্মিলিত চেষ্টার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী দিনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ হবে। এটি আরও বেশি গবেষণানির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে, এটাই তাঁর প্রধান প্রত্যাশা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবার আগে আমাদের এমন একটি একাডেমিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সততা, মেধা, গবেষণার মান এবং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা সর্বোচ্চ মূল্য পাবে। সেখানে অন্যের লেখা চুরি বা অন্য কোনো অনৈতিক কাজের একদমই কোনো সুযোগ থাকবে না। আর এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রতি আমরা প্রকৃত সম্মান দেখাতে পারব। এটিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সবশেষে ববি হাজ্জাজ তাঁর ভুল স্বীকার করে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁর একটি আংশিক বক্তব্য যেহেতু সমাজে কিছুটা ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছে এবং অনেকেই এতে অনেক বেশি অসন্তুষ্ট হয়েছেন, তাই তিনি বিষয়টি আর বাড়াতে চান না। তাঁর এই মন্তব্যের কারণে তাঁর নিজের অনেক প্রিয়জন ও শুভাকাঙ্ক্ষীও মনে কষ্ট পেয়েছেন। সে জন্য সবার অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি নিজের সেই বিতর্কিত বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। তিনি আন্তরিকভাবে আশা করেন, তাঁর এই বার্তার পর এ বিষয়ে মানুষের মনে আর কোনো বিতর্ক বা ভুল-বোঝাবুঝি অবশিষ্ট থাকবে না। সাধারণ মানুষ এখন তাঁর এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ