ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় একত্র হয়েছিলেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। শুক্রবার, ২৯ মে সকালে উপজেলার বিখ্যাত শেখপাড়া দুঃখী মাহমুদ ডিগ্রি কলেজ মাঠে এক বিশাল ঈদ পুনর্মিলনী সভার আয়োজন করে স্থানীয়রা। এই উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। দীর্ঘদিন পর নিজের পুরোনো বিদ্যাপীঠে এসে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তবে শুধু আনন্দের গল্পেই তিনি নিজের বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি। এলাকার মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সমাজ ও দেশের কিছু গভীর সংকটের কথা তিনি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সবার সামনে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় আইনমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুতর একটি অভিযোগ আনেন। তিনি উপস্থিত হাজারো মানুষের উদ্দেশে বলেন, এলাকার মসজিদগুলোতে বেহেশতের টিকিট বিক্রির নামে একটি বিশেষ শক্তি গোপনে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষের ধর্মভীরুতা ও আবেগকে পুঁজি করে এই গোষ্ঠী সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং উগ্রবাদী চিন্তা ছড়াচ্ছে। “বেহেশতের টিকিট” বলতে মূলত অন্ধভাবে কোনো মতবাদ মেনে নিলে পরকালে মুক্তির যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, মন্ত্রী সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষ অনেক সময় না বুঝেই এদের ফাঁদে পা দেন এবং নিজেদের সর্বস্ব খুইয়ে বসেন। মন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই অপশক্তির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকে এই ধরনের ধোঁকাবাজদের হাত থেকে নিজেদের সমাজকে রক্ষা করার জন্য সবসময় সজাগ থাকার পরামর্শ দেন।
শেখপাড়া দুঃখী মাহমুদ ডিগ্রি কলেজ আইনমন্ত্রীর নিজের শিক্ষাজীবন পার করার এক আবেগের জায়গা। ঐতিহাসিক এই অঙ্গনের একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে তিনি উপস্থিত সবার কাছে বিশেষ একটি দাবি রাখেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পবিত্র শিক্ষাঙ্গন ও শৈলকুপার মাটিতে কোনোভাবেই মৌলবাদের বিষবৃক্ষ বড় হতে দেওয়া যাবে না। সাবেক ছাত্র হিসেবে তিনি স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনুরোধ করেন, তারা যেন ওইসব ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়ান। সমাজে কেউ যেন ধর্মের নামে মিথ্যাচার করে কোনো বিভেদ তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে বলেন তিনি।
সমাজকে ধ্বংস করার পেছনে মৌলবাদের পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহতা নিয়েও মন্ত্রী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বর্তমানে দেশের গ্রামগঞ্জেও মাদকের কালো থাবা বিস্তার করেছে। অর্থনীতিবিদদের একটি হিসাব অনুযায়ী, দেশে অবৈধ মাদকের পেছনে প্রতি বছর প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার ($২৫০,০০০,০০০) বা হাজার হাজার কোটি টাকা নষ্ট হচ্ছে। এই বিশাল অঙ্কের টাকা সরাসরি আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারিদের পকেটে চলে যাচ্ছে। পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের মাদকমুক্ত করতে রিহ্যাব বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আরও হাজার হাজার ডলার খরচ করছে। এর ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও তথ্য দেন। বর্তমানে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ঘটা ছোট-বড় অপরাধের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% ঘটনার সঙ্গেই মাদকাসক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে পারিবারিক সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো মাদকের কারণেই বেশি ঘটছে। তাই মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে সমাজকে বাঁচাতে মন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও একযোগে কাজ করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, পুলিশ একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, যদি না প্রতিটি পরিবার তাদের সন্তানদের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। বাবা-মায়েদের খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে। পরিবারের একটু সচেতনতা একটি জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।
সমাজের এই দুটি প্রধান ব্যাধি—মাদক ও মৌলবাদ দমনে তরুণ সমাজকেই মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণদের সরাসরি উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “তোমরাই আমার প্রধান সারথি। এই সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব তোমাদের কাঁধেই নিতে হবে।” তরুণরা যদি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সঠিক পথে হাঁটে, তবে কোনো অপশক্তিই দেশের ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা গুজবে কান না দেওয়ার কড়া পরামর্শ দেন।
এই ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানটি এলাকার মানুষের জন্য এক দারুণ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও দলমত নির্বিশেষে এই অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন বাবর ফিরোজ, স্থানীয় জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা মোজাম্মেল হোসেন তোজাম এবং ত্রিবেণী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আলী মোল্লা। তারা সবাই মনোযোগ দিয়ে মন্ত্রীর কথা শোনেন এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
ঈদ পুনর্মিলনীর এই চমৎকার আয়োজন এলাকার মানুষের মাঝে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। শুধু উৎসবের আনন্দ নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্ত বার্তা নিয়ে সবাই ঘরে ফিরেছেন। মাদকমুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক একটি সুন্দর শৈলকুপা গড়তে সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ। এলাকার সচেতন নাগরিকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সবাই মিলে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে ধর্ম ব্যবসায়ী ও মাদক কারবারিরা খুব দ্রুতই আমাদের সমাজ থেকে চিরতরে বিতাড়িত হবে।ধি














