পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র এক দিন বাকি। সারা দেশের মানুষ যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দে মেতে ওঠার জন্য শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখন একদল মানুষ রাজপথে নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। পরিবার ছেড়ে, ঈদের সব আনন্দ ভুলে তারা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। নিজেদের চাকরি এমপিওভুক্ত করার একদফা দাবিতে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকেরা গত ২১ মে, বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে টানা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন। তাদের কণ্ঠে এখন একটাই স্লোগান—এমপিও ছাড়া শূন্য হাতে ঘরে ফেরা নয়। দেশের এই বড় উৎসবের মুহূর্তে শিক্ষকদের এমন কঠোর অবস্থান সাধারণ মানুষের মনেও গভীর দাগ কাটছে।
স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলো দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তারে একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু চরম সত্য হলো, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যেখানে নিয়মিত আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, সেখানে ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এই শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো একই সিলেবাসে, একই সময়ে ক্লাস নিয়ে এবং একই ধরনের সরকারি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করিয়েও তারা দিনের পর দিন চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অনেক শিক্ষক ১০ থেকে ৩০ বছর ধরে এক টাকাও সরকারি বেতন পাননি। বর্তমানের এই চড়া মূল্যের বাজারে বিনা বেতনে সংসার চালানো কতটা কঠিন, তা শুধু এই ভুক্তভোগী শিক্ষকেরাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারদর হিসাব করলে দেখা যায়, একটি সাধারণ পরিবারের মাসিক ন্যূনতম খরচ মেটাতে অন্তত ১০০
থেকে১৫০(ডলার) প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই শিক্ষকেরা মাস শেষে শূন্য হাতে বাড়ি ফেরেন। এমন অবহেলা তাদের জীবনকে একেবারে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
পেটে ক্ষুধা আর বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে এই শিক্ষকেরা এবার অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা এবারের ঈদ উৎসব পুরোপুরি বর্জন করবেন। তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে তারা জানান, যেখানে তাদের সন্তানদের মুখে দুই বেলা দুমুঠো ভালো খাবার তুলে দেওয়ার সামর্থ্য নেই, সেখানে নতুন পোশাক বা কোরবানির পশু কেনা তাদের কাছে দিবাস্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু। একটি বেসরকারি জরিপ করলে দেখা যাবে, এসব স্বতন্ত্র মাদ্রাসার প্রায় ৮০% শিক্ষক বর্তমানে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। তাই এবার তারা বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আরামদায়ক বাড়ির বদলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের খোলা রাস্তাতেই তারা পবিত্র ঈদের দিনটি পার করবেন।
দীর্ঘ বঞ্চনা ও রাজপথের এই অবর্ণনীয় কষ্টের অবসান ঘটাতে শিক্ষকেরা এখন দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন। তাদের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা এখন বর্তমান সরকার। তারই ধারাবাহিকতায় আন্দোলনরত শিক্ষকেরা গত ২৮ মে, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের এই করুণ অবস্থা নিজের চোখে দেখেন এবং তাদের দীর্ঘদিনের জমানো কষ্টের কথাগুলো শোনেন, তবে তিনি নিশ্চিতভাবে একটি সুন্দর ও স্থায়ী সমাধান দেবেন।
টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে বসে থাকায় অনেক শিক্ষকের শারীরিক অবস্থা ইতিমধ্যে বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে। তীব্র গরম, মাথার ওপর কড়া রোদ আর হঠাৎ বৃষ্টির কারণে অনেকেই জ্বর, সর্দি ও পেটের পীড়ায় ভুগছেন। আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রায় ১৫% শিক্ষক বেশ বয়স্ক এবং তারা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো নানা জটিল শারীরিক রোগে আক্রান্ত। তারপরও তারা একটুও দমে যাননি। শারীরিক অসুস্থতা তাদের মনের জোরকে একটুকুও টলাতে পারেনি। উপস্থিত পুলিশ প্রশাসন ও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষ তাদের এই করুণ অবস্থা দেখে গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করছেন। শিক্ষকেরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এবার দাবি আদায় না করে তারা কোনোভাবেই নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন না।
আমাদের দেশের অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। প্রতি বছর শিক্ষা খাতে সরকার মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে। কিন্তু বাজেটের এক বিশাল অংশ বরাদ্দ হলেও ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষকেরা সবসময় এই সুযোগ-সুবিধা থেকে অবহেলিতই থেকে যাচ্ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, সারা দেশের এই কয়েক হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করতে জাতীয় বাজেটের খুব সামান্য একটি অংশ, হয়তো ১%-এরও কম অর্থের প্রয়োজন হবে। শিক্ষকরা হলেন জাতি গড়ার মূল কারিগর। সেই কারিগররা যখন পেটের দায়ে রাস্তায় বসে থাকেন, তখন তা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যই একটি লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সরকার মেগা প্রকল্পগুলোতে বিপুল অর্থ খরচ করতে পারলে মানুষ গড়ার কারিগরদের জন্য এই সামান্য অর্থ বরাদ্দ করা মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। এই সামান্য বিনিয়োগ দেশের গ্রামীণ প্রান্তিক শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষায় এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
আগামীকাল পবিত্র ঈদ। চারদিকে ভেসে বেড়াবে আনন্দের আমেজ আর কোরবানির মাংসের ঘ্রাণ। কিন্তু এর মাঝেই হয়তো প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় শোনা যাবে কিছু অভুক্ত শিক্ষকের দীর্ঘশ্বাস। তবে তারা এখনো বুক ভরা আশা নিয়ে বসে আছেন। পবিত্র ঈদের এই আনন্দের দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তাদের সঙ্গে দেখা করেন বা তার কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে এমপিওভুক্তির একটি কাঙ্ক্ষিত সুসংবাদ পাঠান, তবে এই হাজারো শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট দূর হয়ে যাবে। শিক্ষকেরা প্রবলভাবে আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের এই যৌক্তিক দাবিটি অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন এবং তাদের চোখের জল মুছে দিয়ে এবারের ঈদের দিনটিকে একটি সত্যিকারের উৎসবের দিনে পরিণত করবেন।














