পল্লবীর কালশী বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: নিঃস্ব হাজারো মানুষ, নাশকতার সন্দেহ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর পল্লবী এলাকার কালশী বস্তিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ২৩ মিনিটে এই আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা প্রায় দুই ঘণ্টা টানা চেষ্টা চালিয়ে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ভয়াবহ এই আগুনে বস্তির প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ঘর ও দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এতে পথে বসেছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার নিম্ন আয়ের মানুষ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এত বড় বিপর্যয়ের পরও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির বা মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর ফায়ার সার্ভিস পায়নি।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার সাংবাদিকদের কাছে পুরো পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পরপরই বস্তির কাঁচা ও টিনের ঘরগুলো খুব দ্রুত ভেঙে পড়ে। বস্তির ভেতরে পলিথিন, প্লাস্টিক এবং কাগজের মতো প্রচুর দাহ্য পদার্থ মজুত ছিল। এর সঙ্গে সন্ধ্যার ঝোড়ো হাওয়া যুক্ত হওয়ায় আগুন চোখের পলকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আশপাশে পানির তীব্র সংকট থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের মূল আগুনের কেন্দ্রে পৌঁছাতে কিছুটা বেশি সময় লেগে যায়। আগুন পুরোপুরি নেভাতে কর্মীদের রাতভর কাজ করতে হয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে নাশকতার শক্ত অভিযোগ তুলেছেন বস্তির বাসিন্দারা। তারা জানান, সোমবার বিকেলে বস্তির এক দোকানদারের সঙ্গে স্থানীয় এক যুবকের তুমুল ঝগড়া হয়। ঝগড়ার একপর্যায়ে ওই যুবক রাগের মাথায় পুরো বস্তিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যায়। এলাকাবাসীর দাবি, ওই ঘটনার ঠিক দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পরই বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এরপর ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা ওই যুবককে ধরে বেধড়ক মারধর করেন এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির জানান, তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই যুবককে আটক করেছেন। তবে জনতার মারধরে যুবকটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় পুলিশ তাকে আগে চিকিৎসা দিচ্ছে। সুস্থ হলে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।

ঘটনার খবর পেয়ে রাত ১০টার দিকে কালশী বস্তিতে ছুটে আসেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঘর হারানো মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সান্ত্বনা দেন। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এই আগুন লাগিয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নাশকতার সন্দেহ একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুলিশ ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। দোষী প্রমাণিত হলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি এলাকাবাসীকে কড়া ভাষায় আশ্বাস দেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালশীমুখী রাস্তার ওপর এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বস্তি হারানো শত শত মানুষ ইসিবি চত্বর থেকে কালশী যাওয়ার সড়কের পাশে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেন। কেউ কেউ শেষ সম্বল হিসেবে যে সামান্য জিনিসপত্র বাঁচাতে পেরেছেন, সেগুলো বুকে আঁকড়ে ধরে রাস্তায় বসে কাঁদছেন। বস্তির ঘরগুলোর পাশাপাশি সেখানে থাকা ভাঙারির বড় বড় দোকানগুলোর ১০০% মালামাল পুড়ে গেছে। চোখের সামনে নিজেদের সারা জীবনের তিল তিল করে জমানো সম্পদ পুড়ে ছাই হতে দেখে বস্তিবাসীর কান্নায় চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

এমনই একজন ক্ষতিগ্রস্ত ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল মিয়া। রাস্তার পাশে বসে তিনি হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। আশপাশের দুজন লোক তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কান্নার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জীবনের সবকিছু শেষ হয়ে গেল। আমার দোকানে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালপত্র জমা করা ছিল, যা আমেরিকান ডলারে প্রায় ৪৫,০০০$ (ডলার) এর সমান। আগামীকালই মহাজনের কাছে এই মালগুলো বিক্রি করার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই চোখের সামনে আগুনে আমার সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এখন আমি এই বিশাল দেনা কীভাবে শোধ করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

লাল মিয়ার মতো একই অবস্থা আরেক বাসিন্দা আমির উদ্দিনের। তিনিও বস্তিতে ভাঙারির ব্যবসা করতেন এবং পরিবার নিয়ে দুটি ঘরে থাকতেন। আগুনের লেলিহান শিখা দেখে তিনি শুধু বউ-বাচ্চাকে নিয়ে কোনোমতে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ঘরের কোনো মালামাল আমি বের করতে পারিনি। আমার ঘরে ব্যবসার নগদ ৩৭ হাজার টাকা রাখা ছিল। ঈদের দিন বিকেলে মহাজনকে এই টাকাটা আমার বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগুন আমার ঘরের সঙ্গে সেই নগদ টাকাগুলোও কেড়ে নিল। আমির উদ্দিনের মতো হাজারো মানুষ এখন সামনের দিনগুলোতে কীভাবে বেঁচে থাকবেন, সেই চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

ঢাকা শহরের বস্তিগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিবারই এই আগুনে পুড়ে ছাই হয় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের স্বপ্ন। কালশী বস্তির এই অসহায় মানুষগুলো এখন পুরোপুরি খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। সরকার এবং বিত্তবান মানুষদের এখন উচিত দ্রুত এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং নতুন করে ঘর তোলার ব্যবস্থা না করলে এই সাড়ে তিন হাজার মানুষের বেঁচে থাকাই অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ