ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি: হরমুজ প্রণালি চালুর আশায় বিশ্ব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email
Donald-Trump

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তিকে যুগান্তকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে তিনি নিজেই খুব খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন যে, এই চুক্তি এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। পরমাণু জ্বালানির মজুত, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো আলোচনাই হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করছে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে হয়তো এসব বিষয়ে সমাধান আসবে। তবে আপাতত ট্রাম্প এমন একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন, যা চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বাড়াবে। এর চেয়েও বড় খবর হলো, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি আবার সচল হতে পারে, যা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকটের অবসান ঘটাবে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সরাসরি মধ্যস্থতা করে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে এই আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছেন। তার এই উদ্যোগের ফলে খাদের কিনারে থাকা একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত হয়ে আসছে। ট্রাম্প এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা যদি এই চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় সই করেন, তবে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের এই প্রধান জলপথটি আবার খুলে যাবে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম বেড়ে প্রায় ৪.৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। তাই এই চুক্তি রিপাবলিকান দলের জন্য অনেক বড় একটি স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

মাত্র ১১ সপ্তাহ আগে ট্রাম্প বেশ কড়া সুরে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ না করলে ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না। কিন্তু চলতি সপ্তাহে এসে তিনি সেই কঠোর অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছেন এবং তার কথা বলার সুরও বেশ নরম হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রতিনিধিরা বেশ ভালোভাবেই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন এবং তিনি তাদের চুক্তির জন্য তাড়াহুড়া না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মূলত ট্রাম্প ইরানের একটি বড় দাবির কাছে নতিস্বীকার করেছেন। ইরান চেয়েছিল সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা পরে হোক। ট্রাম্প তা মেনে নিয়েছেন, তবে বিনিময়ে তিনি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দেওয়া অবরোধ অন্তত সাময়িকভাবে তুলে নিতে বাধ্য করতে পেরেছেন।

আসলে দুই দেশের সামনেই পিছু হটা ছাড়া খুব বেশি ভালো কোনো বিকল্প ছিল না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করতে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরানের কাছে এখনো ১১ টনের বেশি পারমাণবিক জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৭০ পাউন্ড জ্বালানি সরাসরি বোমা তৈরির উপযুক্ত। এগুলো মাটির অনেক গভীরে ধ্বংসস্তূপের নিচে সম্পূর্ণ নিরাপদে আছে। এছাড়া সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানের বর্তমান সরকার পতন ঘটিয়ে সাবেক কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর যে ছক আমেরিকা কষেছিল, তা-ও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে তারা ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুরু করবেন। তিনি দাবি করেন, ইরান তাদের ৬০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। তবে ইরান প্রকাশ্যে এখনো এই বিষয়ে একটি কথাও বলেনি। কারণ, এই ইউরেনিয়াম এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষমতাই তাদের দর-কষাকষির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। অন্যদিকে, ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আকার ও পাল্লার ওপর কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা মানতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইসরায়েলের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার কারণ, কারণ তারা ইরানের অনেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি নিশানার মধ্যে রয়েছে।

দেশের ভেতরে ট্রাম্প এই চুক্তি নিয়ে নিজ দলের নেতাদের কাছেই কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন। রিপাবলিকান দলের অনেক কট্টরপন্থী নেতা বলছেন, ট্রাম্প চাপের মুখে ইরানের কাছে মাথা নত করেছেন। সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, এর ফলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে তারা যা কিছু অর্জন করেছিলেন, তার সবই বৃথা যাবে। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পারমাণবিক সমস্যার মতো এত বড় জটিলতার সমাধান করা সম্ভব নয়। এখন তাদের প্রধান কাজ হলো হরমুজ প্রণালি চালু করে অর্থনীতি বাঁচানো।

এই চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অনেকটাই ধোঁয়াশায় ঘেরা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা শত শত কোটি ডলার কীভাবে অবমুক্ত করবে এবং তেল বিক্রির ওপর থাকা দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা কীভাবে প্রত্যাহার করবে, তা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। মার্কিন কর্মকর্তারা একটি নতুন নীতির কথা বলছেন—’নো ডাস্ট, নো ডলারস’। অর্থাৎ, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস না করে, তবে তারা কোনো ডলার পাবে না। ট্রাম্পও বলেছেন, তিনি বারাক ওবামার মতো ইরানকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ দেবেন না। ওবামা ১৯৭০-এর দশকে আটকে থাকা ১.৭০ বিলিয়ন ডলার ইরানকে ফেরত দিয়েছিলেন। ট্রাম্প নিজের চুক্তির পক্ষে বড় বড় কথা বললেও, বাস্তবতা হলো এখনো কাগজে-কলমে কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ