দেশের বিচার বিভাগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এবার চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের তরুণ সংসদ সদস্য এবং ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেছেন, দেশের বিচার বিভাগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি ঠিক আগের স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে। সোমবার, ২৫ মে বিকেলে ঝিনাইদহ শহরের প্রাণকেন্দ্র পায়রা চত্বরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন জনপ্রতিনিধির এমন সাহসী বক্তব্য সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আব্দুল্লাহ সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সহিংসতার কথা সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন। বিশেষ করে এনসিপির জনপ্রিয় নেতা নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর ওপর হওয়া অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তিনি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানান। এই হামলার পর এলাকার পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এনসিপি এবং বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও সংঘাত তৈরি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে থানায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হয় এবং এরপর পুলিশ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন, প্রশাসনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে একতরফাভাবে তাদের দলের নিরীহ কর্মীদের চরম হয়রানি করা হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে ঢোকানো হচ্ছে।
বিচার বিভাগের বর্তমান স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই তরুণ সংসদ সদস্য চরম হতাশা প্রকাশ করেন। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দেশের সাধারণ মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে ভেবেছিল, নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে দেশের বিচার বিভাগ ১০০% স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ যেমন দেশের পবিত্র আদালতকে নিজেদের দলীয় কার্যালয় বানিয়ে ফেলেছিল, বিএনপিও এখন ঠিক সেই একই কাজ করার ঘৃণ্য চেষ্টা করছে। তারা পুলিশ প্রশাসন ও আদালতকে নিজেদের পকেটে পুরে বিরোধী মতকে দমন করার সেই পুরোনো নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এমন বেআইনি চর্চা চলতে থাকলে সাধারণ গরিব মানুষ কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না বলে তিনি সবাইকে সতর্ক করেন।
শুধু বিচার বিভাগই নয়, দেশের প্রায় সব জায়গায় এখন নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। হাসনাত আব্দুল্লাহ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন প্রকৃত মেধাকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে শুধু দলীয় পরিচয় ও আত্মীয়স্বজন দেখা হচ্ছে। আমাদের দেশের প্রায় ২০% থেকে ৩০% শিক্ষিত তরুণ এখন বেকারত্বের অভিশাপে ভুগছেন। তারা দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে পড়াশোনা করেন একটি ভালো চাকরির স্বপ্নে। কিন্তু মেধার মূল্যায়ন না করে যদি শুধু দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের সুপারিশে অযোগ্য লোকদের চাকরি দেওয়া হয়, তবে এই মেধাবী তরুণেরা হতাশায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? অর্থনীতিবিদদের মতে, মেধার এমন অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের দেশ প্রতি বছর হাজার হাজার মিলিয়ন ডলার ($) সমপরিমাণ বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে, কারণ যোগ্য লোক দেশের জন্য কাজ করার সঠিক সুযোগ পায় না।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই হাসনাত আব্দুল্লাহর যৌক্তিক বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে দলের সাধারণ কর্মীদের ওপর হওয়া অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানান। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরাও রাজনৈতিক দলগুলোর এই পাল্টাপাল্টি মামলা ও রাস্তায় মারামারির কারণে চরম আতঙ্কে দিন পার করছেন। বাজারে জিনিসপত্রের দাম এমনিতেই মানুষের নাগালের বাইরে, তার ওপর এমন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আতঙ্ক সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কয়েক গুণ কঠিন করে তুলছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চিরতরে বন্ধ করতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পরপরই বিকেল গড়িয়ে গেলে পায়রা চত্বর থেকে এনসিপির উদ্যোগে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলে দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত মিছিলটি পায়রা চত্বর থেকে শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড় প্রদক্ষিণ করে। এ সময় নেতাকর্মীরা নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর ওপর হামলাকারী প্রকৃত আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং নিজেদের দলের আটক সব নেতাকর্মীর অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলেন। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো মারামারি বা ভাঙচুর এড়াতে মিছিলের চারপাশে বিপুলসংখ্যক সতর্ক পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে সবার সহযোগিতায় পুরো কর্মসূচিটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে দেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন ও ইনসাফপূর্ণ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক সংঘাত এবং পেশিশক্তির অপব্যবহার সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে হতাশ করে তুলছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ তার এই সময়োপযোগী বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে একটি অত্যন্ত পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন। তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেন, এ দেশের সাধারণ মানুষ কোনো দলের অন্ধ ও বোকা ভক্ত নয়। তারা নিজেদের জীবনে শুধু শান্তি, মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং আইনের চোখে সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার চায়।














