শৈলকুপায় কবি গোলাম মোস্তফার ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত: নতুন প্রজন্মের কাছে সাহিত্যকর্ম পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক ও মুসলিম রেনেসাঁর কবি গোলাম মোস্তফার ৬২তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে তাঁর জন্মভূমি ঝিনাইদহের শৈলকুপায়। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কবির স্মৃতিবিজড়িত মনোহরপুর গ্রামে দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে স্থানীয় মানুষ। মনোহরপুর কবি গোলাম মোস্তফা একাডেমি এবং গুণিজন স্মৃতি সংসদ যৌথভাবে কবির পৈতৃক ভিটায় অবস্থিত পাঠাগার ভবনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সকাল থেকেই কবির ভক্ত, গবেষক, স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে সমবেত হন। অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও একটি বিশেষ বর্ণাঢ্য র‍্যালির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানের মূল আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন মনোহরপুর কবি গোলাম মোস্তফা একাডেমির সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন। সভায় বক্তারা কবির কর্মময় জীবন ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। সভাপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যকর্ম আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। তিনি কেবল মনোহরপুর বা শৈলকুপার সন্তান নন, তিনি সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অহংকার। অথচ আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রায় ৮০% শিক্ষার্থী কবির সাহিত্যের গভীরতা সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাহিত্যের নিয়মিত চর্চা না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিকড় ভুলতে বসেছে। তাই তাঁর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত সাহিত্য পাঠচক্র চালু করতে হবে।

প্রখ্যাত এই মনীষী ১৮৯৭ সালে শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কাজী গোলাম রব্বানী এবং মাতা বিবি শরীফুন্নেসা। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, শক্তিমান গদ্যকার, জনপ্রিয় গীতিকার ও আদর্শ শিক্ষক। বিশ শতকের প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তুলতে তিনি তাঁর লেখনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ অভিধায় ভূষিত হন। দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় এই মহান কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যের পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘রক্তরাগ’, ‘খোশরোজ’, ‘কাব্যকাহিনী’, ‘সাহারা’, ‘হাসনাহেনা’ ও ‘বনি আদম’ বিশেষভাবে সমাদৃত। তবে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনী নিয়ে রচিত তাঁর অমর গদ্যগ্রন্থ ‘বিশ্বনবী’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে রয়েছে। কবির রচনায় ধর্মীয় মূল্যবোধ, খাঁটি মানবিক চেতনা, মানবপ্রেম এবং সমাজের নবজাগরণের স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায়। তাঁর রচিত বহু ইসলামী গান ও কবিতা আজও বাংলার ঘরে ঘরে সমানভাবে সমাদৃত। তিনি সাহিত্যের মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাস দূর করে যুক্তিবাদী ও মানবিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

সভায় উপস্থিত অন্য বক্তারা কবির স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণা বাড়ানোর ওপর বিশেষ তাগিদ দেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, জাতীয় পর্যায়ে কবির সাহিত্যকর্ম নিয়ে বড় কোনো গবেষণা উদ্যোগ নেই। এমনকি মনোহরপুরে কবির পৈতৃক ভিটার পাঠাগারটিও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে ভুগছে। স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো না হলে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন ধরে রাখা কঠিন হবে। বক্তারা জানান, দেশে-বিদেশে থাকা কবির অনুসারীরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সহায়তা পাঠিয়ে আসছেন। প্রবাসে থাকা শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনেক সময় $৫০ বা $১০০ ডলার অনুদান পাঠিয়ে এই স্মৃতি সংসদের ছোটখাটো কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করেন। তবে পাঠাগারটিকে পূর্ণাঙ্গ গবেষণাকেন্দ্রে রূপ দিতে সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১০০% টেকসই সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

আলোচনা সভার সমাপ্তি টেনে কবির রুহের মাগফিরাত কামনায় এক বিশেষ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে উপস্থিত সবাই কবির আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা জানান। দোয়া শেষে কবি গোলাম মোস্তফার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি সুশৃঙ্খল র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি কবির বাড়ির প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে গ্রামের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এলাকার বয়োবৃদ্ধ মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া খুদে শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে এই পদযাত্রায় অংশ নেয়। সর্বস্তরের মানুষের এই বিপুল উপস্থিতি প্রমাণ করে, কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন ভক্তদের হৃদয়ে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ