শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত মহাপরিচালকের আকস্মিক পরিদর্শন: সহকারী দিয়ে রোগী দেখায় ক্ষোভ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই আজ আকস্মিক পরিদর্শনে গেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি সরাসরি হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে সার্বিক চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তিনি হাসপাতালের বহির্বিভাগ (আউটডোর), অন্তর্বিভাগ (ইনডোর), জরুরি বিভাগ, ওষুধ মজুতের স্টোররুম এবং যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ইউনিট সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনে এসে চিকিৎসক সংকটের অজুহাতে চিকিৎসাসেবার মান কোনোভাবেই কমানো যাবে না বলে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরিদর্শনকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগে মূল চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি এবং তাঁদের সহকারীদের দিয়ে রোগী দেখার বিষয়টি দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। তিনি দেখতে পান, অভিজ্ঞ এমবিবিএস ডাক্তারের জায়গায় উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসাররা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। একে সরাসরি ‘রোগীদের সাথে প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তিনি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র রোগীরা হাসপাতালে আসেন প্রকৃত ডাক্তারকে নিজেদের রোগ দেখাতে। কিন্তু ডাক্তারদের চেয়ারে বসে সহকারীরা চিকিৎসা দিচ্ছেন এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি অবিলম্বে এই অনিয়ম বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

৫০ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শৈলকুপার ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসার ভরসা। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ জন সাধারণ মানুষ মাত্র ৫ টাকার টিকিট কেটে বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসেন। কিন্তু হাসপাতালের মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ৬০% চিকিৎসকের পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের অভাব থাকায় রোগীরা নিয়মিত সঠিক সেবা পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত মহাপরিচালক এই চিকিৎসক ঘাটতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শোনেন এবং কর্তৃপক্ষকে বিকল্প ব্যবস্থাপনায় সেবা চালু রাখার কড়া নির্দেশ দেন।

হাসপাতালের ওষুধের স্টোর পরিদর্শনকালে তিনি বিনামূল্যে বিতরণের জন্য আসা সরকারি ওষুধের মজুত খতিয়ে দেখেন। সেখানে সরকারের কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সঠিক নিয়মে সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করেন তিনি। ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, সরকার প্রতিবছর প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লাখ লাখ টাকার ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বরাদ্দ দেয়। সাধারণ রোগীরা যাতে সরকারি এই ওষুধের শতভাগ (১০০%) সুবিধা পান, তা স্থানীয় প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রোগীদের ভর্তি থাকা অন্তর্বিভাগ ঘুরে দেখার সময় তিনি শয্যার চাদর, খাবার সরবরাহ এবং ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পর্যবেক্ষণ করেন। ইনডোরে ভর্তি থাকা একাধিক রোগীর শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে তিনি চিকিৎসার মান নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি কর্তব্যরত সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের রোগীদের সঙ্গে সর্বদা মানবিক আচরণ করার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেবার মান কোনো অবস্থাতেই নামিয়ে আনা যাবে না। চিকিৎসকদের শতভাগ সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা এবং নির্ধারিত দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে।

পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান এবং ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। এছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নির্দেশ পেয়ে সিভিল সার্জন দ্রুত চিকিৎসকের শূন্য পদ পূরণের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর আশ্বাস দেন এবং বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা নিশ্চিতে নিয়মিত তদারকির অঙ্গীকার করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ এই কর্মকর্তার আকস্মিক আগমনে হাসপাতালজুড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাঞ্চল্য ও সতর্কতা তৈরি হয়। সাধারণ রোগীরা জানান, বড় স্যারেরা এভাবে কোনো খবর ছাড়া হঠাৎ এসে পরিদর্শন করলে হাসপাতালে অনিয়ম অনেকটাই কমে যায়। তারা আশা করছেন, এই পরিদর্শনের পর থেকে তাঁরা আর চিকিৎসকের সহকারীদের দিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে না এবং হাসপাতালে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ