ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং এলাকাকে অপরাধমুক্ত করতে দিন ও রাতের এক বিশেষ অভিযান চালিয়েছে থানা-পুলিশ। এতে বিভিন্ন মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার (৪ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাঁদের আটক করে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৪ জন নিয়মিত মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি এবং বাকি ৬ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি। পুলিশ গ্রেপ্তার সবাইকে রোববার আদালতে পাঠালে বিজ্ঞ বিচারক মাদকসেবীদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন। পুলিশের এমন কঠোর পদক্ষেপে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
থানা-পুলিশ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে আদালতের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে থাকা পলাতক অপরাধীদের ধরতেই এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। অভিযানে দামুকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী মোছা. রেখা খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা দুজন শৈলকুপা সিআর ৫৩৬/২৬ নম্বর মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি ছিলেন। একই দিনে তামিনগর গ্রাম থেকে ঝিনাইদহ সিআর ১৯৫/২৬ নম্বর মামলার দুই পলাতক আসামি মো. আবু নাইম শেখ ও মো. পিকুল আলী শেখকে আটক করা হয়। পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের চারজনকেই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিদের পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযানে শৈলকুপার বিভিন্ন স্থান থেকে হাতেনাতে ৬ মাদকসেবীকে পাকড়াও করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য স্থানে মাদক গ্রহণ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ জানায়, তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং মাদকের বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি এই ধরনের ঝটিকা অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এই বিশেষ অভিযানে শুধু স্থানীয় মাদকাসক্তরাই নয়, পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলা থেকে এলাকায় এসে মাদক নেওয়া ব্যক্তিরাও পুলিশের জালে আটকা পড়েছেন।
আদালতে তোলা হলে বিচারক আটক ৬ মাদকসেবীকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে মাগুরা সদর উপজেলার পারনান্দুয়ালী গ্রামের মৃত সাহেব আলী বাদশার ছেলে আল-আমিনকে (৩২) ৯ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা না দিলে তাঁকে আরও ৭ দিন জেলে থাকতে হবে। এছাড়া মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার দরিয়াপুর নতুনপাড়ার মো. পারভেজ শিকদার ওরফে রমজানকে (২৮) ৭ মাসের কারাদণ্ড ও ২,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে তাঁকে অতিরিক্ত ১৫ দিন সাজা খাটতে হবে।
আদালত শৈলকুপা পৌরসভার কাজীপুরের মো. আশিক মণ্ডলকে (২৪) সর্বোচ্চ ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১,০০০ টাকা জরিমানা করেছেন, অনাদায়ে তাঁকে অতিরিক্ত ১৫ দিন জেল খাটতে হবে। এছাড়া ছোট বোয়ালিয়ার স্বপন আলী মোল্লাকে (৪০) ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে তাঁর সাজা আরও ১০ দিন বাড়বে। অন্যদিকে ভাণ্ডারিপাড়ার দুই যুবক মো. ইমামুল শেখ (২৬) ও মো. শাকিল মিয়াকে (২৪) আদালত ৬ মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০০ টাকা করে জরিমানা করেন। অনাদায়ে তাঁদের ১৫ দিন করে বিনাশ্রম জেল খাটতে হবে।
আদালত মোট ৬ মাদকসেবীর কাছ থেকে সর্বমোট ৪,৯০০ টাকা অর্থদণ্ড আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ৪১ ডলার ($৪১) সমমূল্যের। এই জরিমানার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। পুলিশ জানিয়েছে, উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও নির্জন স্পটগুলোতে মাদকসেবীদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছিলেন। শৈলকুপা থেকে মাদকের প্রায় ১০০% উৎপাত নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে পুলিশ মাঠে নেমেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযানের কারণে এলাকায় মাদকাসক্তদের আনাগোনা আগের চেয়ে প্রায় ৭০% কমে গেছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, পুরো উপজেলাকে অপরাধ ও মাদকমুক্ত করতে পুলিশ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি জানান, আদালতের পরোয়ানা কার্যকর করা এবং মাদকের বিস্তার রোধে দিন ও রাতের বিশেষ অভিযান নিয়মিত চলবে। অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। সমাজবিরোধীদের বিষয়ে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলবে এবং কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। একই সঙ্গে তিনি এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধীদের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সার্বিক সহায়তা করার জন্য সচেতন নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানান।















