মহেশপুরে ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ গেল ভ্যানচালকের: আহত ৪, ঘাতক চালকের শাস্তির দাবি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের মহেশপুরে বেপরোয়া গতির ট্রাক্টরের ধাক্কায় মামুন হোসেন (৩২) নামের এক ভ্যানচালক প্রাণ হারিয়েছেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ভ্যানে থাকা আরও ৪ জন যাত্রী গুরুতর আহত হন। বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলার কুল্লাগাছা মাদ্রাসার সামনের সড়কে এই রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত মামুন মহেশপুর উপজেলার গাড়াপোতা গ্রামের বাহাদুর খানের পোষ্য ছেলে। সংসারের মুখে খাবার তুলে দিতে সকালে ভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েই তিনি লাশ হয়ে ফিরলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের স্বজনরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালবেলা ৪ জন যাত্রী নিয়ে নিজের ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালিয়ে উপার্জনের উদ্দেশ্যে বের হন মামুন হোসেন। তিনি কুল্লাগাছা মাদ্রাসার কাছাকাছি পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে মাটিবোঝাই একটি ভারী ট্রাক্টর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে আসে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাক্টরটি সজোরে ব্যাটারিচালিত ভ্যানটিকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় ভ্যানটি মুহূর্তের মধ্যে দুমড়েমুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে।

ভ্যানটি উল্টে গিয়ে চালক মামুন ও ৪ যাত্রী সড়কের ওপর আছড়ে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। যাত্রীদের আর্তনাদ শুনে আশপাশের মানুষ দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কালবিলম্ব না করে রক্তাক্ত অবস্থায় ৫ জনকেই উদ্ধার করে মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে মামুন হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা আহত ৪ জনকে হাসপাতালে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন।

এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই মহেশপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাক্টর ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারিচালিত ভ্যান দুটি জব্দ করেছে। ট্রাক্টরের চালক পালিয়ে গেলেও তাকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এছাড়া এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

নিহত মামুনের অকাল মৃত্যুতে গাড়াপোতা গ্রামে এখন গভীর শোকের ছায়া। বাহাদুর খানের দরিদ্র সংসারে মামুনই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তিনি ভ্যান চালিয়ে গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করতেন। সেই সামান্য টাকায় চলত পরিবারের ৫ জন সদস্যের খাবার ও বৃদ্ধ বাবার ওষুধের খরচ। মামুনের মৃত্যুর খবরে তার পরিবারে শোকের মাতম চলছে। স্বজনরা জানান, মামুন সবসময় সাবধানে ভ্যান চালাতেন। ঘাতক ট্রাক্টরের চালকের বেপরোয়া মনোভাবই তাদের একমাত্র অবলম্বন কেড়ে নিল।

বাংলাদেশে গ্রামীণ সড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ও লাইসেন্সবিহীন ট্রাক্টর এবং দ্রুতগতির ট্রলির উৎপাত দিন দিন বাড়ছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৬৫% থেকে ৭০% ঘটে থাকে এসব অননুমোদিত ভারী যানের কারণে। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতির প্রায় $১.২ থেকে $১.৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি ক্ষতি হয়। মহেশপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, কৃষিকাজে ব্যবহারের কথা বলে আনা এসব ট্রাক্টর এখন মাটি কাটার বাণিজ্যিক কাজে দানবের মতো ছুটছে।

কুল্লাগাছা এলাকার বিক্ষুব্ধ বাসিন্দারা জানান, মাদ্রাসার মতো জনবহুল এলাকায় যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার থাকার নিয়ম থাকলেও ট্রাক্টরটি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল। গ্রামীণ সরু রাস্তায় অতিরিক্ত মালবোঝাই এসব যান নিয়মিত বেপরোয়া গতিতে চলায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ক্ষুব্ধ জনতা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কুল্লাগাছা মাদ্রাসার সামনের সড়কে স্থায়ী গতিরোধক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। সেই সাথে লাইসেন্সহীন চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল মামলা দায়েরই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। মহেশপুর উপজেলা প্রশাসনের উচিত গ্রামীণ সড়কে মাটিবাহী ট্রাক্টর ও অনুমোদনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা। অদক্ষ চালকদের কারণে আর কোনো পরিবার যেন মামুনের মতো তাদের একমাত্র অভিভাবককে না হারায়, সেটাই এখন এলাকাবাসীর দাবি। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে না পারলে গ্রামীণ জনপদে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু বন্ধ করা কখনোই সম্ভব হবে না।

সম্পর্কিত নিবন্ধ