ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৫ জন ব্যক্তিকে আটক করেছে। আটকের পরপরই চিকিৎসকদের সহায়তায় তাঁদের ডোপ টেস্ট করানো হলে প্রত্যেকের শরীরেই নিষিদ্ধ মাদকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ টেস্টে ১০০% আসামির শরীরেই মাদক সেবনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর শৈলকুপা থানা পুলিশ আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করে। আদালতের বিচারক সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে শুনানি গ্রহণ করেন। বিচারক সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে আটককৃত ৫ জনকেই বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড এবং নগদ অর্থদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শৈলকুপা থানা পুলিশ জানায়, ০১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ এলাকায় আইনশৃঙ্খলার সার্বিক উন্নতি ও মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যে এই ঝটিকা অভিযান শুরু হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ দল অভিযান পরিচালনা করে। মাদকাসক্তদের কারণে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক কলহ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে এবং যুবসমাজকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করতে পুলিশ কঠোর কৌশল বেছে নিয়েছে। অপরাধীদের হাতেনাতে ধরে দ্রুত আইনের আওতায় আনাই এই মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মূল লক্ষ্য।
অভিযানের সময় সন্দেহভাজনদের আটকের পর শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আধুনিক ডোপ টেস্ট করানো হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন এবং আসল অপরাধী যেন ছাড় না পায়, সেজন্যই এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। পরীক্ষায় মাদক গ্রহণের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল আইনি অভিযোগপত্র তৈরি করে পুলিশ। ডোপ টেস্টের ইতিবাচক ফলাফল আদালতে দাখিল করায় বিচারক খুব সহজেই সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ায় দ্রুততম সময়ে আসামিদের শাস্তি নির্ধারণ করতে পেরেছেন।
আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রথমজন হলেন মো. আকাশ শেখ (২১)। তিনি মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার বিলসুনাই গ্রামের মো. সালাম শেখের ছেলে। তবে আকাশ দীর্ঘদিন ধরে শৈলকুপা থানার নাঙ্গলবাধ বাজার খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। বিজ্ঞ আদালত আকাশকে ০৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। জরিমানার এই টাকা পরিশোধ না করলে তাঁকে আরও ৭ দিন অতিরিক্ত কারাদণ্ড খাটতে হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
দণ্ডিতদের তালিকায় দ্বিতীয় ব্যক্তি শৈলকুপার ডাউটিয়া গ্রামের মৃত এসকেম হাওলাদারের ছেলে মো. রানা হাওলাদার (৩৮)। আদালত রানাকে ০৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ১০,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁকে অতিরিক্ত ৭ দিন কারাভোগ করতে হবে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে তৃতীয়জন হলেন একই উপজেলার কুমিড়াদহ গ্রামের মৃত পিকুল শেখের ছেলে ওসমান শেখ (২৪)। বিজ্ঞ আদালত ওসমানকে ০১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০০ টাকা অর্থদণ্ডের নির্দেশ দেন। জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাঁকে আরও ১৫ দিন জেলে থাকতে হবে।
একই বিচারিক প্রক্রিয়ায় চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে বাগুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত হোসেন আলী জোয়ার্দ্দারের ছেলে মো. আয়াত আলীকেও (৩৬) আদালত ০১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। পাশাপাশি ২০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে অতিরিক্ত ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত পঞ্চম ব্যক্তি হলেন শাহবাজপুর গ্রামের মৃত খোয়াজ উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে বকতিয়ার বিশ্বাস (৫০)। আদালত বকতিয়ারকে ০৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন, যা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁকে অতিরিক্ত ১০ দিন সাজা খাটতে হবে।
আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই শৈলকুপা থানা পুলিশ সাজাপ্রাপ্ত ৫ জন আসামিকে পুলিশি পাহারায় ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মাদক চক্র যেখানে কোটি কোটি $ ডলারের অবৈধ কারবার চালিয়ে সমাজ ধ্বংস করছে, সেখানে তৃণমূল পর্যায়ে এমন তাৎক্ষণিক বিচার এলাকাবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। সরাসরি আদালত কর্তৃক সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে এমন কঠোর দণ্ড দেওয়ায় অন্যান্য মাদকসেবী ও পাচারকারীদের মনেও বড় ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এমন কঠোর অভিযান ও আইনি কার্যক্রম ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে। তিনি বলেন, সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং মাদকমুক্ত শৈলকুপা গড়ে তুলতে পুলিশ কোনো আপস করবে না। মাদকের সাথে জড়িত কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। একই সাথে তিনি স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মাদক কারবারি এবং মাদকসেবীদের যাবতীয় তথ্য দিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে সবসময় সহযোগিতা করার জোরালো অনুরোধ জানান।
















