জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণকে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বললেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে ‘ডাহা ভিত্তিহীন মিথ্যা’ বলে কঠোর জবাব দিয়েছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। গত বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহুর ভাষণের পরপরই এক কড়া বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। মামদানি স্পষ্টভাবে বলেন, ফিলিস্তিনের গাজায় নিজের চালানো বর্বরোচিত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞকে বৈধতা দিতেই নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কোনো বানোয়াট বক্তব্যই এই ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করতে পারবে না যে নেতানিয়াহু একজন আন্তর্জাতিক অপরাধী।

জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দিতে গিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন নিউইয়র্কের ৩৪ বছর বয়সী মুসলিম মেয়রকে। নেতানিয়াহু মামদানিকে সরাসরি ইহুদিবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, মামদানি দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার কারণে নিউইয়র্কের অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। এমনকি তিনি গাজায় চালানো হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা বলে আখ্যা দেন। ভাষণে নেতানিয়াহু মামদানির স্ত্রী রামা দুয়াজির নাম টেনে এনেও বিষোদগার করেন, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সংহতি জানিয়েছিলেন।

নেতানিয়াহুর এই অপপ্রচারের জবাবে জোহরান মামদানি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা বিশ্ববাসীকে আবারও মনে করিয়ে দেন। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২৪ সালেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে হেগের আদালত। নিউইয়র্কের নিজস্ব কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের এখতিয়ার না থাকলেও মামদানি মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারকে জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন নেতানিয়াহু পা রাখামাত্র তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামদানি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনো সাজানো মিথ্যাই আইসিসির সেই পরোয়ানা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অকাট্য সত্যকে বদলাতে পারবে না।

নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘে আক্রমণাত্মক বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন জোহরান মামদানি সেই অধিবেশনকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি নিজের সরকারি বাসভবনে গাজা থেকে আসা কয়েকটি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি পরিবারকে নিমন্ত্রণ জানান এবং তাঁদের সঙ্গে বিশেষ নৈশভোজে অংশ নেন। একই সাথে ফিলিস্তিন ও বিশ্বশান্তির প্রতীক হিসেবে বাসভবন চত্বরে একটি সবুজ জলপাইগাছের চারা রোপণ করেন মামদানি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মানবিক উদ্যোগের একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি শিরোনাম দেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ যেন শান্তির হয়।’ এর মধ্য দিয়ে তিনি যুদ্ধের বদলে শান্তির পক্ষে নিজের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আগামী মাসে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যা নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির জন্য অস্তিত্বের পরীক্ষা। নিজ দেশের ভোটারদের প্রভাবিত করতে নেতানিয়াহু এখন নির্বাচনী প্রচারের বিলবোর্ডে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের ছবির পাশাপাশি মেয়র মামদানির ছবি টাঙিয়ে বিষোদগার করছেন। এমনকি চলতি মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি দুটি বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ করে মামদানিকে দাঙ্গার উসকানিদাতা বানানোর অপচেষ্টা চালান নেতানিয়াহু। গাজায় মার্কিন জনগণের শত শত কোটি $ ডলারের সামরিক অস্ত্র পাঠিয়ে সেখানকার প্রায় ৮৫% বসতবাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সেই অপরাধ থেকে দৃষ্টি সরাতেই তিনি এই অপকৌশল বেছে নিয়েছেন।

মামদানির বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর এই ব্যক্তিগত আক্রোশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন নিউইয়র্কের স্থানীয় শীর্ষ রাজনীতিকরাও। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্রুকলিন ও ম্যানহাটন এলাকার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, নিজের ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহি এড়াতে নেতানিয়াহু যদি ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে তা মার্কিন ও ইসরায়েলি সাধারণ ইহুদিদের নিরাপত্তাকেই আরও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। ল্যান্ডারের এই বক্তব্য মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপা দেওয়া এখন আর সম্ভব নয়। নিউইয়র্কের মতো বৈশ্বিক নগরের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানি ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারের পক্ষে যেভাবে সোচ্চার হয়েছেন, তা বিশ্ববাসীর মনে ন্যায়বিচারের আশা জাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কূটনীতির মঞ্চে নেতানিয়াহু যতই গলাবাজি করুন না কেন, বিশ্বজুড়ে সত্য ও মানবতার জয় অনিবার্য। ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষরণ থামাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা ছাড়া বিশ্বশান্তি ফেরানো অসম্ভব।

সম্পর্কিত নিবন্ধ