ঝিনাইদহের শৈলকুপায় অপরাধ দমন ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে থানা পুলিশ। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একদিকে যেমন দেশীয় মারাত্মক অস্ত্রসহ ডাকাতির প্রস্তুতিকালে তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, অন্যদিকে বিজ্ঞ আদালতে সামারি ট্রায়ালে দোষী সাব্যস্ত ১০ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জেলা পুলিশ সুপারের সার্বিক নির্দেশনায় শৈলকুপা থানা পুলিশ এই সাফল্য অর্জন করে। অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় এনে এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে পুলিশ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। বিজ্ঞ বিচারক শুনানি শেষে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আইনানুগ সাজা ঘোষণা করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা থানা এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে পুলিশ সুপারের নির্দেশে রাত্রিকালীন টহল ব্যাপক জোরদার করা হয়। এরই অংশ হিসেবে ২৩ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১টা ১০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ১৩ নম্বর উমেদপুর ইউনিয়নের পর্বতীপুর গ্রামে অভিযান চালায়। পর্বতীপুর মাঠের ভেতরের নির্জন রাস্তার মোড়ে একদল ডাকাত ডাকাতির উদ্দেশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ওত পেতে ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তিনজনকে আটক করেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন শৈলকুপার রয়েড়া গ্রামের মোঃ খাইরুল ইসলাম (৪৮), রয়েড়া বাজারের মোঃ রাজন মন্ডল (২০) এবং দামুকদিয়া গ্রামের ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর। নিরপেক্ষ পথচারীদের উপস্থিতিতে তাঁদের দেহ তল্লাশি করে বেশ কয়েকটি মারাত্মক দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে কাঠের বাটযুক্ত ৩৩ ইঞ্চি লম্বা একটি রামদা, লোহার পাইপের বাট লাগানো ১৬ ইঞ্চি লম্বা একটি চাইনিজ কুড়াল, ৫ ইঞ্চি লম্বা একটি কেঁচি এবং ৭.৫ ইঞ্চি লম্বা একটি লোহার পেরেক। পুলিশ জানায়, পথচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই চক্রটি।
এদিকে একই দিন শৈলকুপা থানা পুলিশের সোপর্দ করা অপর একটি প্রক্রিয়ায় ১০ আসামির সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচার সম্পন্ন করেন বিজ্ঞ আদালত। আদালত অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামিদের ৩ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সাথে আসামিদের মোট ১২,০০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $100 ডলারের সমপরিমাণ। এই রায়ের ফলে আসামিদের শতভাগ শাস্তি নিশ্চিত হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে প্রত্যেক আসামিকে অতিরিক্ত ৭ দিন থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত জেল খাটতে হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্তদের তালিকায় রয়েছেন কবিরপুরের অনিক হাসান (২৪), রয়েড়া বাজারের রাজন মন্ডল (২০) ও ছোট বোয়ালিয়ার আকরাম হোসেন (২৪)। তাঁদের ৩ মাসের কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ফাজিলপুরের বাবু শেখকে (২৪) ৩ মাসের জেলসহ ৩,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। বেনিপুর আদিবাসীপাড়ার শ্রী ভানু সরকারকে (৩৫) ৩ মাস ১৫ দিন এবং মাগুরার শ্রীপুরের ইকবাল হোসেনকে (৩৫) ৪ মাস ১৫ দিনের সাজা দেওয়া হয়েছে। গোলকনগরের রফিকুল ইসলাম (৪৩) ও কালিগঞ্জের সোনিয়া খাতুনকে (২৫) দেওয়া হয়েছে ৬ মাসের কারাদণ্ড। বাকি দুই আসামি জোহরা খাতুন (২১) এবং শ্রী সোহাগ কুমার (৩৬) ৪ মাসের সাজা পেয়েছেন।
এদিকে নিয়মিত পুলিশি অভিযান ও নৈশ টহলের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। শৈলকুপা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, পুলিশের এমন কঠোর তৎপরতার ফলে এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায় ৫০% কমে গেছে। বিশেষ করে গভীর রাতে যারা মালামালবোঝাই ভ্যান ও নসিমন নিয়ে চলাচল করেন, তাঁরা এখন অনেকটাই নিরাপদ বোধ করছেন। এলাকার সাধারণ মানুষ পুলিশের এই প্রশংসনীয় পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়েছেন।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং শৈলকুপাকে 100% অপরাধমুক্ত রাখতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো ডাকাত চক্র বা চিহ্নিত অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, অস্ত্রসহ আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত সাজা প্রদান আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়াবে এবং এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
















