কেইন-এমবাপ্পে নাকি বিশ্বজয়ী স্পেন? ব্যালন ডি’অরের লড়াই উসকে দিলেন দে লা ফুয়েন্তে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

লন্ডনে আগামী ২৬ অক্টোবরের জমকালো রাতটি যত ঘনিয়ে আসছে, ফুটবল বিশ্বে ব্যালন ডি’অর নিয়ে আলোচনা ও উত্তাপ ততই বাড়ছে। ইউরোপের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তিগত গোলবন্যার কারণে বায়ার্ন মিউনিখের হ্যারি কেইন এবং রিয়াল মাদ্রিদের কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ফেভারিট হিসেবে এগিয়ে রাখছে। বিভিন্ন জরিপেও ফুটবলপ্রেমীদের প্রায় ৬৫% ভোট যাচ্ছে এই দুজনের পক্ষে। কিন্তু বিশ্বজয়ী স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এই হিসাব একেবারেই মানতে নারাজ। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি যাদের হাতে উঠেছে, তাদের বাদ দিয়ে অন্য কারও হাতে ব্যালন ডি’অর ওঠা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

পরিসংখ্যানের বিচারে অবশ্য কেইন ও এমবাপ্পে দুজনই অবিশ্বাস্য এক মৌসুম কাটিয়েছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ৬৫ গোল করেছেন হ্যারি কেইন। বিশ্বকাপে আরও ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে এনে দিয়েছেন তৃতীয় স্থান। অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ৫০ গোল করার পর বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়েছেন এমবাপ্পে। এক আসরে ১০ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে রেকর্ড ১৪টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসে লিওনেল মেসি ও মিরোস্লাভ ক্লোসাকে টপকে এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনও তাঁর দখলে। ফুটবল বাজারে এমবাপ্পের বর্তমান দলবদল মূল্য প্রায় $২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

তবে গোলের এই বিশাল পাহাড় দেখে মোটেও বিচলিত নন স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তে। সম্প্রতি ২০৩২ ইউরো পর্যন্ত স্পেনের ডাগআউটে থাকার নতুন চুক্তি সেরেছেন তিনি। এরপর স্প্যানিশ জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান ‘এল লারগুয়েরো’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের দলের খেলোয়াড়দের হয়ে প্রকাশ্য প্রচারণায় নামেন। ইউরো জয়ের পর গত বছর রদ্রির ব্যালন ডি’অর জয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ফুটবল মাঠে সার্বিক খেলা ও কৌশলের বিচারে স্প্যানিশরাই এখন বিশ্বের সেরা ও শতভাগ নিখুঁত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কারের ক্ষেত্রে স্প্যানিশদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে বিচারকরা প্রায়ই অনীহা দেখান।

এবারের ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্পেনের মোট ছয়জন তারকা ফুটবলার জায়গা পেয়েছেন। তাঁরা হলেন লামিনে ইয়ামাল, রদ্রি, ফেরান তোরেস, ফাবিয়ান রুইজ, মার্ক কুকুরেয়া ও তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসি। স্প্যানিশদের দলগত সাফল্যের পাল্লা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বহুগুণ ভারী। তারকা মিডফিল্ডার ফাবিয়ান রুইজ চলতি বছরে একই সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ জিতে অনন্য এক রেকর্ড গড়েছেন। এছাড়া মধ্যমাঠ শাসন করে বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ জিতেছেন রদ্রি এবং টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন কুবারসি।

তবে স্প্যানিশদের মধ্যে ব্যক্তিগত অর্জনে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বার্সেলোনার ১৮ বছর বয়সী বিস্ময়বালক লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনাকে লা লিগা শিরোপা জেতানোর পথে তিনি নিজে ২৪টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৭টি গোল। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে মোট ৪১ গোলে অবদান রেখে তিনি ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন। এছাড়া প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে তিনি ৪২৯ বার ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করে রেকর্ড ২২৫ বার সফল হন, যা শতকরা হিসেবে প্রায় ৫২% এর বেশি কার্যকারিতা প্রমাণ করে। সম্প্রতি দলবদল বাজারে ইয়ামালের বাজারমূল্যও এখন $১৮০ মিলিয়নের কাছাকাছি।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেছিলেন, ব্যালন ডি’অর মানে শুধুই কারও ৮০টা গোল করা নয়। অনেকেই একে কেইন ও এমবাপ্পের গোলসংখ্যার দিকে ইঙ্গিত করে কটাক্ষ হিসেবে দেখলেও স্পেন কোচ দে লা ফুয়েন্তে সেখানে কোনো দোষ খুঁজে পাননি। তিনি তরুণ শিষ্যের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ইয়ামাল অত্যন্ত সরল ও সৎভাবে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করেছে। এমবাপ্পের মতো ইয়ামালের মধ্যেও বিশ্বসেরা হওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্যতা রয়েছে। দুজন ভিন্ন ঘরানার খেলোয়াড় হলেও আগামী এক দশক তারা বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করবে। ইয়ামাল যদি নিজের যোগ্যতায় পুরস্কার জয়ের স্বপ্ন দেখে, তবে সেখানে কাউকে ছোট করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

এখন কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর ফ্রান্স ফুটবলের জুরি বোর্ডের বিচারকদের দিকে। বিচারকেরা কি কেবল কেইন বা এমবাপ্পের অবিশ্বাস্য গোলসংখ্যার দিকে তাকিয়ে ভোট দেবেন, নাকি দে লা ফুয়েন্তের যুক্তি মেনে বিশ্বকাপ জয় ও দলের ওপর ব্যক্তিগত প্রভাবকে বেশি প্রাধান্য দেবেন? ব্যক্তিগত গোলবন্যা নাকি দলগত শ্রেষ্ঠত্ব কোনটি শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অরের মানদণ্ড হিসেবে জয়ী হবে, সেই রোমাঞ্চকর প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর মিলবে লন্ডনে আগামী ২৬ অক্টোবর রাতে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ