পাকশীর ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজের রেলসেতুর পিলারে ট্রলারের ধাক্কা লাগার পর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৫ ঘণ্টা। কিন্তু পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে যাওয়া ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর ছাত্রদল নেতা রকির কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি। সময় যত গড়াচ্ছে, পরিবারের আশা ততই ক্ষীণ হয়ে আসছে। নিখোঁজ ছেলের অপেক্ষায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর এলাকার কবিরপুর গ্রামের বাড়িতে এখন শুধুই বুকফাটা আর্তনাদ। ছেলের কাপড় বুকে জড়িয়ে রকির মায়ের একটানা আহাজারিতে পুরো গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। স্বজনদের চোখের জল কিছুতেই থামছে না।
স্থানীয় সূত্র ও বেঁচে ফেরা যাত্রীরা জানান, গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে শৈলকুপার কাতলা গড়াই ঘাট থেকে ৫০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে একটি বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ছাড়ে। মাজার জিয়ারত ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে তাঁরা বের হয়েছিলেন। কিন্তু রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফেরার পথে ট্রলারটি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে পৌঁছালে ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। অন্ধকারের মধ্যে ট্রলারের চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটি সেতুর একটি শক্ত পিলারে সজোরে আছড়ে পড়ে। বিকট শব্দে ট্রলারের সামনের ৩ জন যাত্রী ছিটকে নদীতে পড়ে যান।
অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা সহযাত্রী লিটন সেই রাতের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে শিউরে ওঠেন। তিনি বলেন, ধাক্কা লাগার সাথে সাথে ট্রলারের প্রায় ১০০% মানুষ ভয়ে চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি, আব্দুল ওহাব এবং রকি ছিটকে নদীর গভীর পানিতে তলিয়ে যান। লিটন জানান, রাতের অন্ধকারে চারপাশ তখন সম্পূর্ণ কালো। পদ্মার প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোত তাঁদের নিচের দিকে টেনে নিচ্ছিল। সৌভাগ্যক্রমে তিনি ও আব্দুল ওহাব স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন । পরে স্থানীয় জেলেরা নৌকা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে এসে তাঁদের দুজনকে টেনে তোলে। কিন্তু রকিকে চোখের পলকেই প্রবল ঢেউ গ্রাস করে নেয়।
দুর্ঘটনার পর শুক্রবার রাত থেকেই শুরু হয় রকির উদ্ধার তৎপরতা। শনিবার সারাদিন পেরিয়ে রোববার পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ ডুবুরি দল ও নৌ-পুলিশের সদস্যরা পদ্মার বুকে দফায় দফায় তল্লাশি চালান। স্থানীয় জেলেরা প্রায় ২০ থেকে ২৫টি ট্রলার নিয়ে দিনরাত নদীতে জাল ফেলে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে ভাটির দিকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্পিডবোট নিয়ে খোঁজাখুঁজি চলছে। উদ্ধারকারী দলের এক কর্মকর্তা জানান, নদীতে এখন তীব্র স্রোত বইছে এবং পানির নিচে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্য শতাংশ। ফলে ডুবুরিদের কাজ করতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। তবু একটি মুহূর্তের জন্যও উদ্ধারকাজ থামানো হয়নি।
এদিকে শৈলকুপার কবিরপুরে রকির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। রকির মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলেই তিনি বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার বাবাকে তোমরা নদী থেকে এনে দাও, ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই!’ প্রতিবেশীরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই তাঁর কান্না থামাতে পারছে না। রকির বাবা ও ভাইয়েরা নদীর তীরে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে পথ চেয়ে বসে আছেন। রকি এলাকায় অত্যন্ত নম্র ও পরোপকারী তরুণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর এমন নিখোঁজ হওয়ার খবরে পুরো উপজেলায় শোক ও স্তব্ধতা নেমে এসেছে।
রকির সহযোদ্ধা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও পদ্মার পাড়ে ভিড় করছেন। শৈলকুপা পৌর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের উদ্ধার অভিযানে যে গতি থাকা দরকার ছিল, শুরুতে তা দেখা যায়নি। তাঁরা আধুনিক সেন্সর ও ড্রোন ব্যবহার করে নদীর তলদেশে নিখোঁজ রকির অবস্থান শনাক্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত অভিযান জোরদারের দাবি তুলেছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সার্বক্ষণিক উদ্ধারকারী দলের সাথে যোগাযোগ রাখছেন, যাতে রকিকে দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।
৩৫ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কবিরপুরের মানুষ এখনো অলৌকিক কিছুর আশায় পথ চেয়ে আছেন। স্বজনদের একটাই দাবি, জীবিত হোক বা মৃত, রকিকে যেন দ্রুত পরিবারের বুকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। প্রমত্তা পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে এখন শুধু রকির মায়ের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। এই শোকের মুহূর্তে পুরো শৈলকুপাবাসী রকির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন।
















