তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সুযোগ: ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের বেকার সমস্যা দূর করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এক বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে দেশের প্রতিটি উপজেলার ১০ জন করে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাকে খুঁজে বের করা হবে। এরপর তাদের ব্যবসায়িক আইডিয়া বাস্তবায়ন করতে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক তহবিল দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূলত যাদের মেধা ও নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা আছে কিন্তু পুঁজির অভাবে শুরু করতে পারছেন না, তাদের জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই যুগান্তকারী প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘উপজেলা ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’।

এই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশাল তহবিল অনুমোদন করেছে। এই টাকার অর্ধেক অর্থাৎ ২৫০ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই, আর বাকি ২৫০ কোটি টাকা জোগাবে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। দেশের ৬৪টি জেলার ৫০৩টি উপজেলায় মোট ৫ হাজার ৩০ জন তরুণ এই সুবিধার আওতায় আসবেন। শুরুতে দেশের ৮টি বিভাগের ৮টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কাজ শুরু হবে। সেখানে সফলতা আসলে খুব দ্রুতই সারা দেশের সব উপজেলায় এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি জেলায় একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করবে এবং উদ্যোক্তা বাছাইয়ের কাজটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা যুক্ত থাকবেন।

এই অর্থায়নের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কেবল সাধারণ ঋণ নয়। এখানে ঋণ এবং অনুদান—উভয় সুবিধাই থাকছে। উদ্যোক্তারা ৪ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ পাবেন। ঋণের পাশাপাশি টাকার একটি অংশ দেওয়া হবে ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে শর্তসাপেক্ষ অনুদান হিসেবে। যদি কোনো উদ্যোক্তা সেই অনুদানের টাকা ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক কাজে সঠিকভাবে ব্যবহার করেন, তবে তাঁকে সেই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু যদি কেউ টাকা পাওয়ার পর সেটির অপব্যবহার করেন বা ব্যবসায় ঠিকমতো কাজে না লাগান, তবে সেই অনুদানের টাকাটি সাধারণ ঋণে রূপান্তরিত হবে এবং তাঁকে সুদে-আসলে ফেরত দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে ব্যবসা করার প্রচুর আগ্রহ আছে। কিন্তু ব্যাংকিং জটিলতা এবং প্রাথমিক মূলধনের অভাবে অনেক ভালো আইডিয়া শুরুতেই ঝরে পড়ে। এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা কেবল টাকাই পাবেন না, বরং ব্যবসা টেকসই করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগও পাবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হলো, যদি লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক উদ্যোক্তাও সফলভাবে টিকে যায়, তবে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যাবে এবং বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী টাকার পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে, তবে তা অবশ্যই ২০ লাখ টাকার নিচে থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু সতর্কবার্তা দিয়েছেন। উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেনের মতে, এই উদ্যোগের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করবে সঠিক মানুষ বাছাইয়ের ওপর। তিনি মনে করেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্যরা টাকা পেয়ে লুটপাট করে। তাই এবার যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক পরিচয় দেখে টাকা না দেওয়া হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান মনে করেন, টাকা দেওয়ার আগে উদ্যোক্তাদের পেশাদার প্রশিক্ষণ দেওয়া খুব জরুরি। কিস্তিতে টাকা দিলে এবং নিয়মিত তদারকি করলে এই প্রকল্প থেকে বড় ফলাফল আসা সম্ভব।

দেশের উপজেলা পর্যায় থেকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা উঠে আসলে গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ৫০০ কোটি টাকার তহবিল যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ করা হয়, তবে তরুণরা বিদেশে পাড়ি না জমিয়ে নিজ এলাকাতেই শিল্প-কারখানা বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবেন। এতে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান আরও বাড়বে। এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে প্রকৃত তরুণরাই যেন এই সরকারি সুবিধা ভোগ করতে পারেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ