ক্লাসরুমে শিক্ষিকার সিনেমা দেখার দৃশ্য ধারণ: সাংবাদিকের ওপর মব সৃষ্টির চেষ্টা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধার সাঘাটায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান বন্ধ রেখে শ্রেণিকক্ষে মুঠোফোনে সিনেমা দেখার চিত্র ক্যামেরায় ধারণ করায় এক সংবাদকর্মীর ওপর চড়াও হয়েছেন শিক্ষকরা। শুধু দায়িত্ব পালনে বাধাই নয়, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তারা স্থানীয় লোকজনকে উসকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টির অপচেষ্টা চালান। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম সোহাগ খন্দকার। তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তের সাঘাটা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। সাঘাটা উপজেলার বেড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত সোমবার এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর উপজেলাজুড়ে সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝেও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) দুপুরে ওই সাংবাদিক প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি সাঘাটা উপজেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর এই অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, বেড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ক্লাস নেন না। স্থানীয় অভিভাবকরা শিক্ষকদের চরম গাফিলতি নিয়ে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছিলেন। গ্রামবাসীদের সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরতেই তিনি বিদ্যালয়ে যান।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ০৫ অক্টোবর সোমবার সকাল ১১টা ৩৮ মিনিটে সাংবাদিক সোহাগ খন্দকার তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সরাসরি ওই বিদ্যালয়ে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেন এবং শ্রেণিকক্ষগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্লাস চলার কথা থাকলেও কোনো শ্রেণিকক্ষেই কোনো শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি। অর্থাৎ ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল পুরোপুরি ০% (শূন্য শতাংশ)। এরপর তিনি শিক্ষকদের কক্ষে গিয়ে সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেন মিলনকে অলসভাবে মুঠোফোন ব্যবহার করতে দেখেন। পাশের শ্রেণিকক্ষে সহকারী শিক্ষিকা রুমি নিজের মুঠোফোনে গভীর মনোযোগে হিন্দি সিনেমা দেখছিলেন।

বেতনভুক্ত শিক্ষকদের এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডের বাস্তব চিত্র প্রমাণের স্বার্থে সাংবাদিক সোহাগ খন্দকার দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় ধারণ করেন। এরপর তিনি সহকারী শিক্ষিকা রুমির কাছে গিয়ে বিনীতভাবে জানতে চান, তিনি ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক কি না। ঠিক তখনই সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেন মিলন মারমুখী আচরণ শুরু করেন। তিনি কর্কশ গলায় চিৎকার করে জানতে চান, কার অনুমতি নিয়ে সাংবাদিক বিদ্যালয়ে ঢুকেছেন এবং কেন শিক্ষিকার ভিডিও ধারণ করেছেন। একপরয়ায়ে শিক্ষক মিলন সাংবাদিকের ওপর চড়াও হন এবং স্থানীয় ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষকে জড়ো করে মারধরের উদ্দেশ্যে মব তৈরির চেষ্টা চালান।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সাংবাদিক সোহাগ খন্দকার তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনে সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে বিষয়টি জানান। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় পরিচিত সচেতন নাগরিকদের সাহায্য চান। পরে শিক্ষা কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশ এবং স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দ্রুত হস্তক্ষেপে তিনি মবের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে নিরাপদে বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। সচেতন মানুষের এমন ইতিবাচক ভূমিকা না থাকলে ওই সংবাদকর্মী বড় ধরনের শারীরিক হামলার শিকার হতেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার প্রতি বছর লাখ লাখ ডলার ($) সমমূল্যের অর্থ ব্যয় করছে। এর পাশাপাশি বাজেটের বড় অংশ শিক্ষকদের বেতন বাবদ খরচ হচ্ছে। অথচ কিছু শিক্ষকের চরম খামখেয়ালিপনায় প্রাথমিক শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকছে। ক্লাসের সময়ে শিক্ষকরা না পড়িয়ে হিন্দি সিনেমা ও ফেসবুকে মেতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া অনিয়ম প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা করতে সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে তোলার এই অপসংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। তারা অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল্লাহেল কাফি জানান, সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা এবং মব সৃষ্টির চেষ্টার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগপত্র তারা পেয়েছেন। বিষয়টি শিক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। খুব দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ধরনের দায়িত্বহীনতা, পাঠদানে অবহেলা কিংবা শিক্ষাঙ্গনে অরাজকতা কোনো অবস্থাতেই বরদাশত করা হবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে দোষীদের বিরুদ্ধে এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে যেন ভবিষ্যতে কেউ এমন করার সাহস না পায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ