শৈলকুপায় ডোপ টেস্টে মাদক সেবন প্রমাণিত: আদালতের সংক্ষিপ্ত বিচারে দুই যুবকের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে আটক দুই যুবকের শরীরে মাদকের ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়েছে। ডোপ টেস্টে তাদের ফলাফল পজিটিভ প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দুজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন। মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) বিকেলে আদালত এই রায় ঘোষণা করে দণ্ডপ্রাপ্তদের সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেন। সাজাপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি হলেন শৈলকুপা উপজেলার উত্তর কচুয়া গ্রামের মোঃ আশিক মোল্লা এবং পদমদী গ্রামের মোঃ জিহাদ হোসেন। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আদালতে পাঠালে বিজ্ঞ বিচারক তাৎক্ষণিকভাবে শুনানির মাধ্যমে এই আইনি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করেন।

শৈলকুপা থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাদক ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার অংশ হিসেবে পুলিশ এলাকায় নিয়মিত বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে। মঙ্গলবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা শৈলকুপার বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালান। সন্দেহজনক চলাফেরার কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা উত্তর কচুয়া ও পদমদী এলাকা থেকে আশিক ও জিহাদ নামের এই দুই যুবককে আটক করেন। পরে তাদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষার জন্য ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ল্যাব পরীক্ষায় চিকিৎসকরা ১০০% নিশ্চিত হন যে, তারা নিষিদ্ধ মাদক সেবন করেছেন। চিকিৎসকের অকাট্য রিপোর্ট পাওয়ার পরই পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে মাদকের সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করে।

এরপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণি ১৬ ধারা অনুযায়ী পুলিশ তাদের আদালতে সোপর্দ করে। আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিজ্ঞ বিচারক সামারি ট্রায়াল প্রক্রিয়ায় সরাসরি এজলাসে আসামিদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। এ সময় সংক্ষিপ্ত বিচার সি.আর-১৭০/২০২৬ নম্বর মামলায় উত্তর কচুয়া গ্রামের মোঃ আলমগীর হোসেনের ছেলে মোঃ আশিক মোল্লার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিজ্ঞ বিচারক সমস্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে আশিককে ০৯ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। সেই সাথে বিচারক তাকে ১,০০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। জরিমানার অর্থ দিতে না পারলে আশিককে অতিরিক্ত আরও ১০ দিনের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

একই আদালতে শৈল-সি.আর-১৭১/২০২৬ নম্বর অপর সংক্ষিপ্ত বিচার মামলায় মোঃ জিহাদ হোসেনের বিচার সম্পন্ন হয়। জিহাদ শৈলকুপা উপজেলার পদমদী গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সুনামিয়ার ছেলে। তার বিরুদ্ধেও ডোপ টেস্ট পজিটিভ আসার প্রমাণ থাকায় বিজ্ঞ বিচারক তাকে ০৭ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন। এর পাশাপাশি বিচারক তাকে ১০০ টাকা জরিমানা করেন। এই জরিমানা পরিশোধ না করলে জিহাদকে অতিরিক্ত আরও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার পরপরই দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কড়া পাহারায় দুই সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে প্রিজন ভ্যানে তুলে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে নিয়ে যান।

আইনজীবীরা বলছেন, মাদক নির্মূলে প্রচলিত দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার চেয়ে সামারি ট্রায়াল অনেক বেশি কার্যকর। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমে এবং দ্রুত আসামির সাজা নিশ্চিত হয়। মাদকাসক্তি পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ ও চিকিৎসার পেছনে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক পরিসরে কোটি কোটি ডলার ($) এবং দেশের অভ্যন্তরে বিপুল অর্থ অপচয় হয়। এছাড়া সমাজে ঘটে যাওয়া অপরাধগুলোর প্রায় ৮০% ঘটনাই কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত। তাই ডোপ টেস্টের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুত সাজা দেওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ।

অভিযানের বিষয়ে শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, আমরা শৈলকুপাকে মাদকমুক্ত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী কোনো মাদকসেবী কিংবা মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা শতভাগ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত অপরাধীদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি। ফলে নিরপরাধ কারও ভোগান্তি হচ্ছে না, আবার আসল অপরাধীরাও রেহাই পাচ্ছে না। থানা পুলিশের এই কঠোর অবস্থান অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। ওসি পরিবারের অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান, তারা যেন সন্তানদের চলাফেরা ও বন্ধু নির্বাচনের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখেন।

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মাদক ও অপরাধমুক্ত জেলা গঠনের লক্ষ্য নিয়ে শৈলকুপা থানা পুলিশের এ ধরনের বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান এবং আইনি কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও জোরদারভাবে অব্যাহত থাকবে। এলাকার সচেতন নাগরিকরা পুলিশের এমন সক্রিয় অবস্থান এবং বিজ্ঞ আদালতের দৃষ্টান্তমূলক দ্রুত রায়কে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, ডোপ টেস্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে যুবসমাজ মাদক থেকে দূরে থাকবে এবং সার্বিক অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ