তীব্র প্লট সংকট, ভাঙাচোরা সড়ক, অকেজো ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর পানির তীব্র অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র যশোর বিসিক শিল্পনগরী। প্রতিষ্ঠার ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও এখানে আধুনিক কোনো শিল্প সুবিধা গড়ে ওঠেনি। বর্ষার দিনে সামান্য বৃষ্টিতেই মিল-কারখানার ভেতরে নোংরা পানি ঢুকে পড়ে এবং উৎপাদন চরম ব্যাহত হয়। শিল্পমালিকরা প্রতি বছর নিয়মিত কোটি কোটি টাকার সার্ভিস চার্জ পরিশোধ করলেও বিসিকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না। অন্যদিকে নতুন শিল্প গড়ে তোলার জন্য বহু তরুণ ও অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা বছরের পর বছর প্লটের জন্য ঘুরছেন। কিন্তু খালি জমি না থাকায় কাউকে নতুন প্লট দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় ১৯৬২ সালে প্রায় ৫০ একর জমির ওপর এই বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হয়েছিল। বিসিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১২২টি শিল্প ইউনিটে উৎপাদন চালু রয়েছে। এসব কারখানায় হালকা প্রকৌশল বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক ও কেমিক্যালসহ হরেক রকমের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, এখানকার কারখানাগুলো থেকে বছরে গড়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বা প্রায় $৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে এই শিল্প এলাকায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৬,৯১৮ জন শ্রমিক। এদের মধ্যে প্রায় ৪৩% অর্থাৎ ২,৯৮৬ জনই নারী কর্মী।
বিশাল এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার মাঝেও চরম অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় কারখানা মালিকরা। এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, ১৯৬২ সালে যখন এই শিল্পনগরী যাত্রা শুরু করে, তখন মাত্র ২৫টি ইউনিটের চাহিদা মেটাতে একটি ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প বসানো হয়েছিল। সেই পুরোনো পাম্প দিয়েই এখন ১২২টি কারখানার পানির প্রয়োজন মেটানো হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে পানির সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে কারখানার নিত্যদিনের কাজ চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হলো, কোনো কারখানায় যদি দুর্ঘটনাবশত অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে নেভানোর জন্য বিসিকের ভেতরে পর্যাপ্ত পানির কোনো উৎস নেই।
শিল্পনগরীর অভ্যন্তরীণ যাতায়াত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সিইএ ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস জানান, বিসিকের প্রায় ৩ কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেনের সিংহভাগ এখন চলাচলের অযোগ্য। সামান্য বৃষ্টি হলেই নোংরা পানি উপচে রাস্তায় জমে থাকে। পুরো এলাকায় কোনো কার্যকর সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক বা বিসিকের জন্য নির্ধারিত আলাদা বিদ্যুৎ ফিডার নেই। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানার দামি যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া রাতে পর্যাপ্ত সড়কবাতি এবং স্থায়ী কোনো পুলিশ ক্যাম্প না থাকায় শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। ফলে রাতে কাজ করা প্রায় ৩ হাজার নারী শ্রমিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারখানায় যাতায়াত করেন।
এদিকে প্লটের তীব্র সংকট দূর করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালের ৮ মে দ্বিতীয় একটি শিল্পনগরী স্থাপনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। প্রাথমিক পরিকল্পনায় যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ফতেপুর মৌজায় ৪০ একর খাসজমিতে একটি স্বতন্ত্র অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কথা ছিল। পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে যশোর সদর উপজেলার রামনগরে একটি আধুনিক ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত নকশা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছরেও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অথচ যশোর শহর ও এর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা শত শত হালকা প্রকৌশল ও মোটর মেকানিক ওয়ার্কশপ সরকারি প্লটের অভাবে খোলা আকাশের নিচে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
অবকাঠামোগত চরম দুর্বলতা ও অনিশ্চয়তার কারণে নতুন দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যশোরে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে সতর্ক করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান অবিলম্বে বিদ্যমান বিসিকের আধুনিকায়ন এবং রামনগরের নতুন শিল্প পার্কের কাজ দ্রুত শুরুর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে সংগঠনের সভাপতি আলহাজ্ব মিজানুর রহমান খান জোর দিয়ে বলেন, স্থানীয় শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে জটিল আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৫% থেকে ৬%-এ নামিয়ে এনে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যমান নানামুখী সংকট ও ক্ষোভের বিষয়ে যশোর বিসিক জেলা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-মহাব্যবস্থাপক এম এনাম আহমেদ জানান, অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিকল্প ও টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটি খসড়া প্রস্তাব ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, রামনগরে প্রস্তাবিত আধুনিক লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্কের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য জোর চেষ্টা চলছে। নতুন এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উদ্যোক্তাদের প্লট সংকটের প্রায় ৮০% সমাধান হবে এবং অতিরিক্ত আরও অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার বেকারের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
















