ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ৫ জনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ আসায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর শৈলকুপা থানা পুলিশ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক অভিযান চালিয়ে এই ৫ ব্যক্তিকে আটক করে। এরপর শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ডোপ টেস্ট করানো হলে চিকিৎসকরা তাদের শরীরে মাদক সেবনের প্রমাণ নিশ্চিত করেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করে। পরে বিজ্ঞ বিচারক সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচারকাজ শেষ করে আসামিদের সশ্রম কারাদণ্ড ও নগদ জরিমানা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার কয়েকটি এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা ও দৌরাত্ম্য সাম্প্রতিক সময়ে বেশ বেড়ে গিয়েছিল। মাদকের এই আগ্রাসন বন্ধ করতে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের কাছে নিয়মিত দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে এবং অপরাধ কমাতে শৈলকুপা থানা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। সেই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশের একাধিক টিম উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে চিরুনি অভিযান চালায়। এই অভিযানে সরাসরি মাদক সেবনরত অবস্থায় এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ৫ জনকে হাতেনাতে পাকড়াও করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
পুলিশ জানায়, আটকের পর কোনো ধরনের অনুমানের ওপর নির্ভর না করে শতভাগ নিশ্চিত হতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। আটক ব্যক্তিদের শৈলকুপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে ডোপ টেস্ট করা হলে সবার রিপোর্টেই পজিটিভ ফল আসে। অর্থাৎ তাদের রক্তে মাদক গ্রহণের উপস্থিতি ১০০% প্রমাণিত হয়। আধুনিক এই প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে অপরাধীরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করার কোনো সুযোগ পায়নি। পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্ত মেডিক্যাল রিপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে আসামিদের আদালতে উপস্থাপন করে।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বিজ্ঞ বিচারক সামারি ট্রায়ালে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিক এই সাজা ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে লক্ষীপুর গ্রামের মোঃ আজাদ শেখের ছেলে মোঃ সোয়েব ওরফে সোহেব আক্তার (২৯)-কে ৭ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০০/- টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও ১০ দিন অতিরিক্ত জেল খাটতে হবে। অন্যদিকে পদমদী গ্রামের তারিফ মন্ডলের ছেলে মোঃ সোহাগ মন্ডল (৩৭)-কে ৪ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০০/- টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক হিসেবে প্রায় ২০$ সমমূল্যের। এই অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাকে অতিরিক্ত ১৫ দিন কারাভোগ করতে হবে।
একই আদেশে আদালত বড় মৌকুড়ি গ্রামের মোঃ বাদশা হোসেনের ছেলে মোঃ ফরহাদ হোসেন (২২)-কে ৫ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০০/- টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ১০ দিন কারাদণ্ড দেন। এছাড়া চর মৌকুড়ি গ্রামের মোসলেম মোল্লার ছেলে মোঃ মফিজুল ইসলাম (৩০)-কে ৪ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০/- টাকা জরিমানা করা হয়, অনাদায়ে তাকে ১৫ দিন অতিরিক্ত সাজা ভোগ করতে হবে। একই গ্রামের মহিত শিকদারের ছেলে মোঃ ইদ্রিস আলী (৩৩)-কে আদালত ৫ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০০০/- টাকা অর্থদণ্ড দেন এবং অর্থদণ্ড পরিশোধ না করলে আরও ১৫ দিন জেলহাজতে থাকার নির্দেশ দেন।
আদালতের এই দ্রুত ও কঠোর রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শৈলকুপার সাধারণ মানুষ। স্থানীয় অভিভাবকরা মনে করছেন, ডোপ টেস্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচার কার্যকর করায় এলাকায় মাদকের অপব্যবহার অন্তত ৮০% থেকে ৯০% কমে আসবে। তরুণদের বিপথগামী হওয়া রোধ করতে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষ বলছেন, অতীতে অনেকে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেত, কিন্তু এবার চিকিৎসকের রিপোর্ট থাকায় কেউ রেহাই পায়নি। এলাকাবাসী পুলিশের এই ধারাবাহিক তৎপরতাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে শৈলকুপা থানা পুলিশ বদ্ধপরিকর। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণনেশা থেকে বাঁচাতে পুলিশের এই কঠোর আইনি ও প্রসিকিউশন কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও পুরোদমে অব্যাহত থাকবে। কোনো মাদকসেবী কিংবা মাদক কারবারিকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে এলাকার সচেতন নাগরিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান। বিচারিক কার্যক্রম শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামিকে ওই দিনই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
















