মাঠ কাঁপিয়ে ক্লাসরুমে লড়াই: যশোরে শামস্-উল-হুদা একাডেমিতে তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের ফুটবলার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ভোরের নরম আলো ফুটতেই যশোরের শামস্-উল-হুদা ফুটবল একাডেমির সবুজ ঘাসে নেমে পড়ে একঝাঁক স্বপ্নবাজ কিশোর। কারও পায়ে ড্রিবলিংয়ের জাদু, কারও ক্ষিপ্র শট আছড়ে পড়ছে জালে; কিন্তু সবার চোখেই লাল-সবুজের জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে খেলার এক অভিন্ন স্বপ্ন। ঘামে ভেজা এই তরুণদের জীবন কেবল মাঠেই বন্দি নয়। সকালের অনুশীলন শেষে ঘড়ির কাঁটায় ৯টা বাজতেই এদের হাতে ওঠে বই-খাতা। দুপুর ২টা পর্যন্ত স্কুলে পড়াশোনা, বিকেলে ফের বল পায়ে মাঠে ঘাম ঝরানো এবং মাগরিবের পর গৃহশিক্ষকের কাছে পাঠ্যবইয়ের পড়া ঘুমানোর আগ পর্যন্ত চলে স্বপ্নজয়ের এই দ্বিমুখী লড়াই। বর্তমানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ৬০ জন আবাসিক ও ১২৩ জন অনাবাসিক মিলে মোট ১৮৩ জন শিক্ষার্থী এখানে ফুটবল ও জীবনের পাঠ নিচ্ছে।

এই বিদ্যাপীঠের বড় বিশেষত্ব হলো, এটি সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের ১০০% বিনা খরচে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলে। আবাসিক কিংবা অনাবাসিক কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই ফুটবল প্রশিক্ষণের জন্য একটি পয়সাও ফি নেওয়া হয় না। এমনকি আবাসিক শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া এবং রাতে গৃহশিক্ষকের পড়ানোর পুরো খরচও একাডেমি বহন করে। শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের স্কুল বা কলেজের সামান্য মাসিক বেতন দেয়। রেডিয়েন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা নাসের শাহরিয়ার জাহেদীর নিজস্ব অর্থায়নে এই সুবিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা ও বৈদেশিক মুদ্রার সমমূল্যের ডলার ($) খরচ করে বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

২০১১ সালের ১৪ মে মাত্র ৬০ জন অনাবাসিক ছাত্র নিয়ে ফতেপুর ইউনিয়নের হামিদপুর হাইস্কুল মাঠে এই স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা। এরপর ২০১৩ সালে একটি ভাড়া বাড়িতে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৭ সালের ১৭ মার্চ শিকদারপাড়ায় বিশাল ৮০ বিঘা জমির ওপর উদ্বোধন হয় একাডেমির স্থায়ী মাঠ। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয় আধুনিক ছয়তলা ‘ভাষাসৈনিক মুসা মিয়া ভবন’। বর্তমানে এই ভবনে একসাথে ২৪০ জন শিক্ষার্থীর থাকার সুযোগ রয়েছে। সেখানে জিমনেশিয়াম, ডিজিটাল লাইব্রেরি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, কনফারেন্স রুম, বড় ডাইনিং হল এবং নামাজ কক্ষের চমৎকার বন্দোবস্ত আছে।

একাডেমিতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত ১২, ১৪, ১৬, ১৮ এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্ব মোট ৫টি বয়স ভিত্তিক ক্যাটাগরিতে প্রশিক্ষণ চলে। ১২ বছর বয়সীদের সপ্তাহে ৪ দিন বিকেলে মাঠে নামানো হয়। খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব শেখাতে সার্বক্ষণিক দায়িত্বে আছেন জাতীয় পর্যায়ের ৫ জন দক্ষ কোচ। প্রতিবছর ১৯ ডিসেম্বর সারা দেশ থেকে আসা শত শত প্রার্থীর মধ্য থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই ও ট্রায়ালের মাধ্যমে মাত্র ১০% থেকে ১৫% প্রতিভাবান ফুটবলারকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে এখানে সুযোগ পাওয়া প্রতিটি তরুণই মেধার স্বাক্ষর রাখে।

এই নিবিড় পরিচর্যার ফসলও মিলছে হাতেনাতে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত একাডেমির ২২ জন ফুটবলার ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, বাহরাইন, কাতার, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও চীনের মতো বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই বিদ্যাপীঠের বেশ কয়েকজন কিশোর ফুটবলার বিশ্বের ফুটবল তীর্থ ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও চীনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছে। দেশের ঘরোয়া ফুটবলেও শামস্-উল-হুদার জয়জয়কার। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগসহ দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে দাপটের সাথে খেলছেন এই একাডেমির ২৩ জন খেলোয়াড়।

একাডেমির অন্যতম সেরা আবিষ্কার ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বাজে বামনদা গ্রামের তাহসান খাঁ। অনূর্ধ্ব-১৭ দলের এই ফুটবলারের বাবা নেই; মা ও আট ভাই-বোনের অভাবের সংসারে ফুটবল ছিল এক বিলাসিতা। তবে শামস্-উল-হুদা একাডেমি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তাহসান জানায়, এখানে বিনা খরচে থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের সুযোগ না পেলে তার পক্ষে এত দূর আসা অসম্ভব হতো। কঠোর পরিশ্রমের ফলও সে পেয়েছে। ২০২৫ সালে চীনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে সে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বুট’ জয় করেছে।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান তাহসানের মতো অসংখ্য তরুণের কাছে এই একাডেমি শুধু খেলার মাঠ নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার এক নির্ভরযোগ্য পাঠশালা। শৃঙ্খলা, পড়াশোনা ও আধুনিক ক্রীড়াশৈলীর এমন মেলবন্ধন দেশের তৃণমূল ফুটবলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য এখন আরও দূরপ্রসারী কেবল জাতীয় দল নয়, ইউরোপের বড় বড় লিগে একদিন বাংলাদেশের ফুটবলাররা দাপটের সাথে খেলবে। যশোরের বুক চিরে গড়ে ওঠা এই স্বপ্নালয় সেই ঐতিহাসিক দিনের ভিতই মজবুত করছে প্রতিদিন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ