ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদকসহ ধরা পড়ার পর ডোপ টেস্টে প্রমাণ মেলায় পাঁচ ব্যক্তিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর শৈলকুপা থানা-পুলিশ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করে। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের সহায়তায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট করানো হলে তাঁদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। টেস্টের ফল পজিটিভ আসায় পুলিশ তাঁদের দ্রুত আদালতে সোপর্দ করে। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুনানি শেষে আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের রায়ে সবচেয়ে বেশি সাজা পেয়েছেন শৈলকুপার ভাটই আদিবাসীপাড়ার বকুল কুমার বিশ্বাসের ছেলে অশোক (৩৩)। বিচারক তাঁকে সর্বোচ্চ ৯ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে বাজারপাড়ার মৃত তোয়াজ শেখের ছেলে মোঃ মাসুদ শেখকে (৪২) ৭ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানার শান্তিডাঙ্গা গ্রামের নুজদার মন্ডলের ছেলে জাহাঙ্গীর (৩৫) পেয়েছেন ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১০ দিনের কারাদণ্ড।
দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুজন হলেন দুধসর বলফিল্ড এলাকার নাজিম জোয়াদ্দারের ছেলে মোঃ ইনছান জোয়াদ্দার (৪৫) এবং গোবিন্দপুর গ্রামের মোঃ সাজ্জাদ মোল্লার ছেলে মোঃ শামীম মোল্লা (২৬)। আদালত ইনছান জোয়াদ্দারকে ৪ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের জেল দিয়েছেন। এছাড়া সর্বকনিষ্ঠ আসামি শামীম মোল্লাকে ৩ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আদালত পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১ হাজার টাকা করে মোট ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। রায় ঘোষণার পরপরই তাঁদের ঝিনাইদহ জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
শৈলকুপা থানা-পুলিশ জানায়, এলাকায় মাদকসেবীদের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার ভোর থেকে দিনভর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁদের হাতেনাতে পাকড়াও করে। প্রাথমিকভাবে আটক ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণের কথা অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন। তবে চিকিৎসকদের সহায়তায় পরিচালিত ডোপ টেস্টে তাঁদের সকল চালাকি ধরা পড়ে যায়। পরীক্ষায় আটক পাঁচ ব্যক্তির দেহেই শতভাগ অর্থাৎ ১০০% মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। পুলিশের এমন তাৎক্ষণিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপে অপরাধীদের কোনো অজুহাত আদালতে ধোপে টেকেনি।
সীমান্তবর্তী ঝিনাইদহ ও পার্শ্ববর্তী কুষ্টিয়া জেলায় মাদক পাচার ও সেবন আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের কারণে দেশের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র এসব মাদক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ($) মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন চালায়। এই মাদক সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। স্থানীয় পরিসংখ্যান বলছে, গ্রামাঞ্চলে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো প্রায় ৭০% থেকে ৮০% অপরাধের নেপথ্যে রয়েছে মাদকের করাল থাবা। তাই তরুণদের রক্ষায় মাদকসেবীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি ছিল।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে পুলিশ বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী মাদক কারবারি ও নিয়মিত মাদকসেবী উভয়ের বিরুদ্ধেই শৈলকুপা থানা পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল রয়েছে। ডোপ টেস্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ও অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার এই ধারা এলাকায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ওসি স্পষ্ট করে বলেন, শৈলকুপাকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান ও আইনি প্রসিকিউশন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
আদালতের এমন কঠোর পদক্ষেপে শৈলকুপার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। ভাটই, বাজারপাড়া ও দুধসর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদকসেবীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটত। ডোপ টেস্টের মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সংক্ষিপ্ত আদালতের মাধ্যমে বিচার কার্যকর করায় অপরাধীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার হবে। তবে সচেতন মহল মনে করেন, শুধু মাদকসেবীদের সাজা দিলেই চলবে না; যারা বিভিন্ন হাত ঘুরে এসব মাদক এলাকায় সরবরাহ করছে, সেই মূল কারবারিদেরও দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
















