দেশের জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষা করতে হলে মা ইলিশের প্রজনন মৌসুম শুরুর আগেই নদীপারের জেলেদের নৌকা ও জাল সরকারি হেফাজতে জমা নেওয়ার দাবি উঠেছে। বক্তারা বলেছেন, অন্তত ৫ অক্টোবরের মধ্যে প্রজনন অঞ্চলের সব জেলের নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম জমা নিলে ইলিশের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। এই পদক্ষেপ সফলভাবে কার্যকর করতে পারলে বাজারে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার ইলিশ সাধারণ মানুষ মাত্র ১৫০ টাকায় কিনতে পারবেন। রাজধানীর মিরপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ইলিশ সংরক্ষণ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন।
শনিবার বিকেলে আয়োজিত এই আলোচনা ও ইলিশ উৎসবে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি প্রস্তাব করেন, প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মৎস্য কর্মকর্তার দপ্তরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত সব জেলের নৌকা ও জাল ৫ অক্টোবরের মধ্যে জমা রাখতে হবে। এরপর আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন নদীতে সব ধরণের মাছ ধরা পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে। কোনো নৌকা যেন নদীতে নামতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে।
আহমেদ আবু জাফর বলেন, প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের নামে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব খরচ হয়। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও সাংবাদিকদের নিয়ে নদীতে মহড়া দিতে হয়, জেলেদের পেছনে ধাওয়া করতে হয়। এতে প্রায় ৭০% থেকে ৮০% সরকারি অর্থ ও সময় অপচয় হয়। অথচ আগেভাগে নৌকা ও জাল আটকে রাখলে কোনো ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কিংবা লাঠিপেটার দরকার পড়বে না। এমনকি অবৈধ জাল পোড়ানোর ঝক্কিও থাকবে না। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যে জেলেরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নৌকা বা জাল জমা দেবেন না, তাদের সরকারি জেলে কার্ড বাতিল করতে হবে।
সভায় বক্তারা নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রান্তিক জেলেদের সহায়তার ওপর জোর দেন। তারা বলেন, শুধু পেটে টান থাকলে জেলেরা নদীতে নামতে বাধ্য হন। তাই প্রকৃত জেলেদের শতভাগ (১০০%) খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি। নদী থেকে আহরিত ইলিশ রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় $৫০ থেকে $৬০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রাখে। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জেলে পরিবারগুলোর সামাজিক সুরক্ষায় জোর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক তথ্য সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় অহংকার ও অর্থনীতির প্রাণ। এই সম্পদ যদি আমরা বাঁচাতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু পুলিশের পাহারা দিয়ে নদী বা ইলিশ রক্ষা করা যাবে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং অবৈধ ইলিশ কেনা বন্ধ করতে হবে। সাধারণ মানুষ বাজারে যাওয়া বন্ধ করলেই অসাধু জেলেদের মাছ ধরা এমনিতেই থেমে যাবে।
মিরপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিএম কাদেরের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন দৈনিক বাংলা ৭১-এর সম্পাদক প্রবীর সিকদার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম বিভাগের ডিন ড. হানিফ খান, বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সাহেদ মন্তাজ, মাইটিভির হেড অব নিউজ মাহমুদ ফয়সাল এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মসউদ মান্নান। বক্তারা বলেন, নদীতে অভিযানের পাশাপাশি ইলিশের আড়ত, পাইকারি বাজার ও পরিবহনে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ কারেন্ট জালের উৎপাদন কারখানাগুলো অবিলম্বে গুঁড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দেন তারা।
সভায় ইলিশ রক্ষায় ১০ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে বক্তারা বলেন, নদী, পরিবেশ ও জেলেদের বাদ দিয়ে আলাদা করে কোনো মাছ বাঁচানো সম্ভব নয়। ইলিশ বাঁচাতে হলে নদী দূষণ রোধ করতে হবে এবং জেলেদের এই প্রক্রিয়ার সরাসরি অংশীদার বানাতে হবে। অনুষ্ঠান শেষে আহমেদ আবু জাফর মিরপুর প্রেস ক্লাবের ২০২৬-২০২৯ সেশনের জন্য ২৭ সদস্যবিশিষ্ট নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন। নতুন এই কমিটিতে পুনরায় জিএম কাদের সভাপতি এবং জাকারিয়া সোহাগ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন।
















