কাগজে ৫৪ বাস্তবে দুই শতাধিক: আন্তসীমান্ত নদীর তালিকা নিয়ে অর্ধশতকের অবহেলা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) পুরোনো তালিকায় অভিন্ন নদী মাত্র ৫৪টি। মিয়ানমারের ৩টি মিলিয়ে সরকারি খাতায় আন্তসীমান্ত নদী মোট ৫৭টি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। গবেষক ও নদীকর্মীদের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রকৃত নদীর সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ ৫৫ বছর পার হলেও অভিন্ন নদীর কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। রংপুর বিভাগেই সরকারি হিসাবে মাত্র ১৮টি নদীর নাম রয়েছে, অথচ গবেষকরা সেখানে বাস্তবে ৬৩টি অভিন্ন নদীর সন্ধান পেয়েছেন। অর্থাৎ কেবল উত্তরাঞ্চলেই ৪৬টি নদী কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছাড়াই বয়ে চলেছে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তালিকাতেও রয়েছে আকাশ-পাতাল গরমিল। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৩ সালে তাদের বইয়ে সারা দেশে ১ হাজার ৮টি নদীর মধ্যে মাত্র ৬৮টি নদীকে আন্তসীমান্ত হিসেবে দেখিয়েছে। সেখানে জেআরসির স্বীকৃত ৫৪টি নদীর মধ্যে ১০টির নাম বাদ দেওয়া হয়। আবার পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে দেশের ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদীর তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তসীমান্ত নদীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১২৬টি, যেখানে প্রচলিত তালিকার বাইরে আরও ৮৩টি নতুন নদীর উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে নদী-গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী সারা দেশে ২২৩টি এবং ম ইনামুল হক ১৬৭টি অভিন্ন নদী চিহ্নিত করেছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে নতুন করে আরও ১৬টি নদীর স্বীকৃতির প্রস্তাব পাঠালেও ভারত তা সরাসরি এড়িয়ে যায়।

শুধু ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা নদীই নয়, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া নদীর হিসাব নিয়েও চরম উদাসীনতা রয়েছে। সরকারি তালিকায় কেবল ‘কুলিক’ নদকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবাহিত নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রংপুর বিভাগেই গবেষকরা এমন আরও ১১টি নদীর প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড়ের ডাহুক ও বেরং, দিনাজপুরের ছোট যমুনা ও ভেলামতী, ঠাকুরগাঁওয়ের টাঙন ও কাহালাই এবং লালমনিরহাটের খর্প নদী। সারা দেশে সীমান্তবর্তী প্রতিটি অঞ্চল সঠিকভাবে খতিয়ে দেখলে এমন নদীর সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালিকার বাইরে থাকা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে খর্প, কচুয়া, শালমারা ও সংলির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ। এমনকি তালিকায় থাকা দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীর উৎস নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। ভারতের উজান থেকে খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘা নামের দুটি পৃথক নদী বাংলাদেশে এসে মিলিত হয়ে ‘দেওনাই’ নাম ধারণ করেছে। অথচ মূল নদী খেড়ুয়া ও পাঙ্ঘার নাম তালিকায় নেই। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনো নথিতেই এমন অন্তত ১০টি নদীর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, তালিকায় নদীর নাম না থাকার সুযোগ নিয়ে উজান থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহার করছে ভারত। যেমন কুড়িগ্রামের দুধকুমার অববাহিকার কালজানি, গদাধর ও গঙ্গাধরের মতো বড় বড় খরস্রোতা নদী এখনো জেআরসির আনুষ্ঠানিক তালিকায় জায়গা পায়নি। ফলে উজান থেকে ভারত ইচ্ছেমতো বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে কোনো জোরালো আপত্তি জানাতে পারছে না। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীর পানির প্রবাহ প্রায় ৬০% থেকে ৭০% কমে যায়। পানির অভাবে প্রতি বছর সেচকাজে বাধা পেয়ে কৃষি খাতে দেশের প্রায় $৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও পানিবিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, ১৯৭২ সালে জেআরসি গঠনের সময় কোনো কার্যকর সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে ৫৪টি নদীর তালিকা তৈরি হয়েছিল। সরকারি অবহেলার কারণে গত পাঁচ দশকেও এই তালিকা সংশোধন হয়নি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদারও মনে করেন, সীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সব নদীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি জরুরি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এই জটিল বিষয় এড়িয়ে যাওয়ায় সংকট দিন দিন বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার আন্তরিক হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি করতে পারে। এ জন্য সীমান্তবর্তী প্রতিটি মৌজার সিএস, এসএ ও বিএস রেকর্ড মিলিয়ে সরেজমিন তদন্ত চালানো দরকার। এতে হারিয়ে যাওয়া বা মরে যাওয়া নদীর ইতিহাসও জানা যাবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ন্যায্য হিস্যা ও পানির অধিকার নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে শতভাগ অর্থাৎ ১০০% আন্তসীমান্ত নদীর তালিকা চূড়ান্ত করে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় টেবিলে জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ