মোবারকগঞ্জে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে দুই পা হারানো নারীর মৃত্যু: প্ল্যাটফর্মেই ঘটে হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোবারকগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে চলন্ত ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রাবেয়া খাতুন (৩৭) নামের এক নারী প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার সকাল আটটার দিকে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে যাওয়ার সময় দ্রুত ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে রেললাইনের ওপর পড়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে ট্রেনের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে তাঁর দুটি পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এছাড়া তাঁর একটি হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতর জখম হয়।

নিহত রাবেয়া খাতুন রাজধানী ঢাকার খিলক্ষেত থানার জোয়ার সাহারা এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেনের মেয়ে। স্বজনরা জানান, গত দুই দিন আগে তিনি কালীগঞ্জ পৌরসভার বলিদাপাড়া এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। শনিবার সকালে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মোবারকগঞ্জ স্টেশনে পৌঁছান। ঘরে তাঁর ৮ ও ১৪ বছর বয়সী দুটি ছোট কন্যাসন্তান রয়েছে। মায়ের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে অবুঝ দুই সন্তান ও পুরো পরিবারে এখন গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল আটটার দিকে রাজশাহী থেকে খুলনাগামী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনটি মোবারকগঞ্জ স্টেশনে নির্ধারিত যাত্রাবিরতি শেষে পুনরায় চলতে শুরু করে। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করার ঠিক আগমুহূর্তে রাবেয়া খাতুন তাড়াহুড়ো করে বগিতে ওঠার চেষ্টা করেন। সেলিমা রহমান নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ট্রেনটি গতি নেওয়ার সময় তিনি রাবেয়াকে বারবার চলন্ত ট্রেনে উঠতে নিষেধ করেছিলেন। আশপাশের আরও কয়েকজন যাত্রীও তাঁকে সতর্ক করেন। কিন্তু তিনি কারও কথা না শুনে চলন্ত ট্রেনের হাতল ধরে ওঠার চেষ্টা চালান। অসাবধানতাবশত তাঁর পা পিছলে যায় এবং তিনি প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের মাঝখানের বিপজ্জনক ফাঁকা স্থানে পড়ে যান।

দুর্ঘটনার পরপরই উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও কালীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত এগিয়ে এসে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে রাবেয়াকে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রক্তপাত বন্ধের চেষ্টা চালান। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। এখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে স্বজন ও উদ্ধারকারীরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে যশোর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মোবারকগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোস্তাফিজুর রহমান নয়ন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে দেওয়ার সময় ওই নারী দৌড়ে ওঠার চেষ্টা করার কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিয়মিত মাইকিং ও সতর্কবার্তা দিয়ে যাত্রীদের চলন্ত ট্রেনে ওঠা-নামা করতে সম্পূর্ণ নিষেধ করে। তিনি বলেন, যাত্রীরা যদি শতভাগ বা ১০০% সচেতন না হন, তবে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেশের অনেক স্টেশনের মতো এখানেও প্ল্যাটফর্মের উচ্চতার সঙ্গে ট্রেনের মেঝের কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম উঁচু করতে এবং আধুনিকায়নে বিদেশি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় কয়েক মিলিয়ন $ ও সরকারি অর্থ ব্যয় করছে। তবে সাধারণ মানুষের সামান্য অসতর্কতা মুহূর্তেই এমন প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রেন দুর্ঘটনার প্রায় ৮০% ক্ষেত্রেই অসচেতনতা এবং চলন্ত ট্রেনে ওঠা বা নামার মতো ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা দায়ী থাকে। একটু দেরির চেয়ে জীবনের মূল্য যে অনেক বেশি, এই সহজ সত্যটি যাত্রীরা প্রায়শই ভুলে যান।

কালীগঞ্জ থানা ও রেলওয়ে পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে যশোর রেলওয়ে থানার পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তারা মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করবে। রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা রাবেয়া খাতুনের এমন অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে বলিদাপাড়া ও খিলক্ষেত উভয় এলাকায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে শোকের মাতম চলছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা রেলস্টেশনে যাত্রীদের দায়িত্বশীল আচরণ ও ট্রেনযাত্রায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে নিয়ে এল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ