মিরপুরে মধ্যরাতে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিল দুর্বৃত্তরা: কোটি টাকার মালামাল লুট

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত দীর্ঘ ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে একদল দুর্বৃত্ত। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢোকে। তারা প্রথমে কেন্দ্রের দুই নিরাপত্তাকর্মী আন্দ্রিয় সরকার ও আবদুল হাইকে বেদম মারধর করে একটি খুঁটির সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর কেন্দ্রের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, কম্পিউটার, জরুরি ওষুধপত্র ও নগদ টাকা লুট করে নেয়। সবশেষে ভারী যন্ত্র এনে পাকা ও আধা পাকা ভবনসহ পুরো চিকিৎসাকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে ধূলিসাৎ করে দেয় হামলাকারীরা।

এই নারকীয় ঘটনায় রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার বাদী হয়ে রাজধানীর শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মো. হানিফ মিয়ার (৫০) নাম উল্লেখ করেছেন তিনি। এজাহার অনুযায়ী, লুটপাট ও ভাঙচুরে অন্তত ১ কোটি ৯ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে প্রায় $১ লাখ ডলার সমমানের। দুর্বৃত্তরা কেন্দ্র থেকে ২টি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ১টি জেনারেটর, ২টি কম্পিউটার, ৩টি ফ্রিজ, ৩টি এসি এবং সরকারি ইপিআই টিকার মূল্যবান রেজিস্টার ও স্বাস্থ্য নথিপত্র ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

হামলাকারীরা যাওয়ার আগে মূল ফটকে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়। তাতে লেখা রয়েছে, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া ১০ কাঠা জমির মালিক ওই সমিতি। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিরপুরের অত্যন্ত মূল্যবান এই জায়গাটি দখলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ তুলেছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এই পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তবে সংসদ সদস্য তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ব্যস্ততার কারণে তিনি যেতে পারেননি এবং পুলিশকে নিরপেক্ষ তদন্ত চালানোর কথা বলেছেন।

শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ও ফেয়ার প্লাজা মার্কেটের মাঝে থাকা চিকিৎসাকেন্দ্রটি এখন শুধুই এক ধ্বংসস্তূপ। ভবনের ছাদ ও দেয়াল ভেঙে ইট, সুরকি ও পলেস্তারা চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। কক্ষের কপাটে ও জানালায় ধারালো অস্ত্রের গভীর কোপের ক্ষতচিহ্ন ভেসে উঠেছে। মেঝেজুড়ে শত শত কাচের অ্যাম্পুল, গুঁড়ো ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুল এবং শিশুদের টিকার শিশি নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি প্রাঙ্গণে থাকা ৫০ বছরের পুরোনো আমগাছটির বড় বড় ডালও কুড়াল দিয়ে কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। পাশের এক দোকানি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গরিব মানুষের স্বাস্থ্যকেন্দ্র এভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

১৯৭৪ সালে সুবিধাবঞ্চিত নিম্ন আয়ের মানুষ এবং মা-শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে সুইডিশ সংস্থা ‘রাড্ডা বার্নেন’ এই কেন্দ্রের যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে গত অর্ধশতাব্দী ধরে পরিবার পরিকল্পনা, প্রসূতি সেবা ও জরুরি টিকাদান সফলভাবে পরিচালনা করে আসছিল। এখানকার সেবার প্রায় ৯০% সুবিধাই পেতেন বস্তিবাসী ও অসচ্ছল পরিবারের রোগীরা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ঘটনার পরদিনই এই কেন্দ্রে সরকারি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরুর কথা ছিল। কিন্তু পুরো স্থাপনা ভেঙে ফেলায় হাজারো শিশুর সঠিক সময়ে টিকা পাওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অতর্কিত হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। পুলিশ দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে এবং কাউকে ছাড় দেবে না। অন্যদিকে বিশিষ্ট নাগরিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা অবিলম্বে লুট হওয়া সব মূল্যবান চিকিৎসাসামগ্রী উদ্ধার, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম পুনরায় চালু এবং জড়িত দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি তুলেছেন।

একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ের ওপর এমন সশস্ত্র তাণ্ডব দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের নিরাপত্তাহীনতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। শত শত মায়ের নিরাপদ প্রসব আর শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকার এই আশ্রয়স্থলটিকে এভাবে বলপূর্বক দখলের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে জনস্বার্থের এমন বহু প্রতিষ্ঠান ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনে বিলীন হয়ে যাবে বলে সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ