পাহাড়ি অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুম এলেই খাবার পানি ও ফসলের সেচের চরম সংকট দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝিরি ও প্রাকৃতিক ঝর্ণার পানির প্রবাহ আগের তুলনায় আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জমিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীঘিনালা উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো দুই দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা। স্থানীয় সেবা প্রদানকারীদের (এলএসপি) কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে সংস্থাটি এই বিশেষ আয়োজন করে। প্রশিক্ষকরা অংশগ্রহণকারীদের পানি সংরক্ষণ, অপচয় রোধ ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের কার্যকর কৌশল শিখিয়ে দেন। গ্রামের কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে তারা প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করবেন।
দীঘিনালার কলাবাগানে তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার কার্যালয়ে গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় হেলভেটাস বাংলাদেশ। কর্মশালায় মোট ১৩ জন স্থানীয় প্রতিনিধি অংশ নেন, যার মধ্যে ৭ জন পুরুষ এবং প্রায় ৪৬% অর্থাৎ ৬ জন নারী উদ্যোক্তা ছিলেন। পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি জনপদে নারীদের এমন সক্রিয় উপস্থিতি পুরো প্রশিক্ষণকে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে।
প্রশিক্ষণের প্রথম দিনে পানি ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ সঞ্জন কুমার বড়ুয়া পাহাড়ে পানির জোগান নিশ্চিত করার নানা উপায় তুলে ধরেন। তিনি বিদ্যুৎবিহীন গ্রাভিটি ফ্লো সিস্টেম, মাটির নিচের পানির জন্য ইনফিলট্রেশন গ্যালারি এবং অফ-গ্রিড পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সেশন পরিচালনা করেন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক ঝর্ণা সংরক্ষণ করে কীভাবে পানির অপচয় কমানো যায়, তা শেখান। সনাতন পদ্ধতিতে যেখানে প্রায় ৫০% পানি অপচয় হয়, সেখানে আধুনিক পাইপলাইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি জানান। এছাড়া স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন।
দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীদের জলবায়ু-সহনশীল চাষাবাদ ও সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ শেখান দীঘিনালা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমন। পাহাড়ি ঢালে বেগুন, শসা, লাউ, করলা, টমেটো ও বাঁধাকপি চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন তিনি। তিনি জানান, আধুনিক ড্রিপ সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে প্রায় ৬০% কম পানি লাগে এবং সার সরাসরি গাছের শিকড়ে পৌঁছায়। এতে কৃষকদের শ্রম ও খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে। পাশাপাশি ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের নিয়মও হাতেকলমে দেখিয়ে দেন।
প্রশিক্ষণে স্থানীয় কৃষিসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আয়ের নানা উপায় আলোচনা করা হয়। আয়োজকরা জানান, স্থানীয় উদ্যোক্তারা আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে প্রতি মৌসুমে নিজেদের আয় নিশ্চিত করতে পারেন। একজন প্রশিক্ষিত সেবাদাতা আধুনিক সেচযন্ত্র ও স্প্রিংশিড ব্যবস্থাপনা দিয়ে প্রতি মাসে অনায়াসে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা উপার্জন করতে পারেন। বিশ্বজুড়ে যেখানে পরিবেশবান্ধব কৃষিতে প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন $ ডলার খরচ হচ্ছে, সেখানে প্রত্যন্ত পাহাড়ে স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরি অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা নিজ নিজ গ্রামে গিয়ে অন্য কৃষকদেরও এসব সাশ্রয়ী প্রযুক্তি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করবেন।
দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পাহাড়ে কৃষির প্রধান সংকট হলো পানির অভাব। প্রকৃতিভিত্তিক উপায়ে পানির সঠিক ব্যবহার করতে পারলে রবি মৌসুমেও অনাবাদি জমিতে প্রচুর সবজি ফলানো সম্ভব। তিনি কৃষকদের বহু ফসলি চাষাবাদের আহ্বান জানান। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা মাঠের সম্ভাব্য জটিলতা, যেমন পাইপলাইন নষ্ট হওয়া বা শুষ্ক মৌসুমে পানির উৎস শুকিয়ে যাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলার কৌশল নিয়ে দলগত অনুশীলন সম্পন্ন করেন। মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারা নানা প্রশ্নের সমাধান খুঁজে নেন। এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে পানি নিয়ে কাজ করা তরুণ উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়।
তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা ও হেলভেটাস বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, এই ১৩ জন উদ্যোক্তা এখন থেকে নিজ নিজ এলাকায় গ্রামীণ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা শুধু পানি ও সেচ ব্যবস্থাপনাই করবেন না, বরং জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ক্ষতি রুখতে সাধারণ কৃষকদের পাশে থাকবেন। পাহাড়ে ১০০% টেকসই কৃষি ও পানির নিশ্চয়তা তৈরিতে তৃণমূলের মানুষদের স্বাবলম্বী করার কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় নেতৃত্ব ও কারিগরি দক্ষতা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে তারা মনে করেন।
















