চেক জালিয়াতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যান কারাগারে, পদ নিয়ে জটিলতা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় চেক জালিয়াতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলমকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঝিনাইদহের জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানান। আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সুমন মিয়া শুনানি শেষে জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠানোর কড়া নির্দেশ দেন। জাহাঙ্গীর আলম কোটচাঁদপুরের ৫ নম্বর এলাঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি কাঠালিয়া গ্রামের বাসিন্দা শামসুল আলমের ছেলে।

মামলার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কোটচাঁদপুর মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজের সঙ্গে জমি কেনাবেচা নিয়ে জাহাঙ্গীর আলমের একটি বড় আর্থিক চুক্তি হয়েছিল। জমির মূল্য পরিশোধের অংশ হিসেবে তিনি আব্দুল আজিজকে একটি ব্যাংকের চেক প্রদান করেন। তবে নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় চেকটি প্রত্যাখ্যাত বা বাউন্স হয়। পাওনা টাকা আদায়ে দফায় দফায় চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন ভুক্তভোগী। এই লেনদেনে জড়িত টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $১৭,০০০ মার্কিন ডলারের সমান। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে ২০২১ সালে আব্দুল আজিজ বাদী হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন, যার নম্বর কোটঃ সিআর-এসসি ১০৪৬/২১।

আদালত দীর্ঘ সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনি যুক্তি পর্যালোচনা শেষে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে কারাদণ্ড দেন। একই সাথে চেকের সমপরিমাণ অর্থাৎ ১০০% টাকা জরিমানা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর থেকেই জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন আত্মগোপনে চলে যান। সাজা মাথায় নিয়ে পলাতক থাকলেও তিনি গোপনে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বিভিন্ন সালিশ বৈঠকেও অংশ নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে এলাঙ্গী ইউনিয়ন পরিষদের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজের প্রায় ৪০% কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।

বুধবার সকালে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই জাহাঙ্গীর আলম ঝিনাইদহ জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে হাজির হন। তাঁর পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেন, তিনি সামাজিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাই আপিল করার শর্তে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হোক। তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী জামিনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, একজন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আইনের চোখে কোনো ধরনের ছাড় পেতে পারেন না। উভয় পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক সুমন মিয়া জামিন আবেদন সরাসরি খারিজ করে পুলিশি পাহারায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে একজন ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকতে পারেন কি না, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বি.এম. আব্দুল মান্নান তুহিন বলেন, আদালতের রায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক পরিপত্র বা অনুলিপি এখনো তাঁদের দপ্তরে এসে পৌঁছায়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও পরিপত্র হাতে পেলেই আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন তাঁরা।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহেল রানা জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্ট আইনি নিয়মে পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, “আদালতের রায়ের কপি প্রথমে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যায়। সেখান থেকে নথিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছায়। স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দুই বছরের বেশি সাজা হলে পদ বাতিল হওয়ার বিধান রয়েছে। এই মামলায় সাজার মেয়াদ ও আইনি দিক খতিয়ে দেখে আমরা দ্রুত জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করব।”

জাহাঙ্গীর আলমের কারাগারে যাওয়ার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এলাঙ্গী ইউনিয়ন ও কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জনপ্রতিনিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে চেক জালিয়াতির মতো আর্থিক অপরাধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সচেতন ব্যবসায়ী বলেন, স্থানীয় সরকারে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে এমন অপরাধীদের শতভাগ জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তারা আশা করছেন, দ্রুত এই শূন্য পদে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিয়ে এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ