মাদকের বিরুদ্ধে শৈলকুপা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: ওসি হুমায়ূন কবিরের জিরো টলারেন্স নীতি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাদকের করাল গ্রাস থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে থানা পুলিশ। উপজেলাজুড়ে মাদক নির্মূলে সরাসরি ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছেন শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা। তাঁর সরাসরি নেতৃত্বে দিন-রাত একটানা সাঁড়াশি অভিযান চলছে। উপজেলার শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে মাদক কারবারি, চোরাচালানি ও মাদকসেবীদের কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। পুলিশের এমন কঠোর পদক্ষেপে অপরাধী চক্রের ভেতরে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

থানা সূত্রে জানা যায়, শৈলকুপা উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব গোপন পথ দিয়ে পাশের জেলা ও সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক ঢুকত, সেসব পয়েন্টে সার্বক্ষণিক পুলিশি টহল বসানো হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের দেওয়া গোপন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ নিয়মিত ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে, মাদক কেনাবেচা, পরিবহন বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

পুলিশের তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে চালানো বিশেষ অভিযানে শৈলকুপার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ৭০ জনের বেশি চিহ্নিত মাদক কারবারি ও মাদকসেবীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কয়েক হাজার পিস ইয়াবা, বিপুল পরিমাণ গাঁজা ও ফেনসিডিল উদ্ধার করেছে পুলিশ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা বা প্রায় $১২,০০০ ডলার। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকায় প্রায় ৮০% ছোট-বড় অপরাধ ও পারিবারিক কলহের মূলে রয়েছে এই নেশার বিস্তার। ধারাবাহিক অভিযানের কারণে গত দুই মাসে চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক অশান্তির ঘটনা অন্তত ৪০% কমেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

মাদকবিরোধী এই অভিযান প্রসঙ্গে শৈলকুপা থানার ওসি মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, শৈলকুপাকে সব ধরনের অপরাধ ও মাদক থেকে মুক্ত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। মাদকের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা কোনো রাজনৈতিক তদবির বা সুপারিশ গ্রাহ্য করছি না। দল-মত নির্বিশেষে যেকোনো মূল্যে শৈলকুপাকে একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত জনপদে পরিণত করতে পুলিশ সদস্যরা দিনরাত মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, যতক্ষণ না পর্যন্ত শৈলকুপা থেকে মাদক সিন্ডিকেট পুরোপুরি নির্মূল হবে, ততক্ষণ এই নিয়মিত অভিযান থামবে না।

সম্প্রতি শৈলকুপার এক স্থানীয় অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও মাদকের বিরুদ্ধে একই রকম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, মাদক যেন আমাদের সুন্দর সমাজকে কোনোভাবেই গ্রাস করতে না পারে, সেজন্য সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আইনমন্ত্রীর এমন সুস্পষ্ট বার্তার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল আরও বেড়ে গেছে। সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে মিল রেখে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ এখন সমন্বিতভাবে মাঠপর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।

মাদকের বিস্তার রোধ করা কেবল পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে সাধারণ মানুষকেও এই প্রতিরোধে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। বিশেষ করে পরিবারের অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কিশোর-তরুণদের মেলামেশা ও চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। পরিবারগুলো যেন সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেয় এবং তাদের আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে দ্রুত সঠিক ব্যবস্থা নেয়, সে বিষয়েও সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় মাদক কারবারের খবর পেলেই নির্ভয়ে থানায় তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

শৈলকুপা থানার পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, মাদকবিরোধী এই বিশেষ অভিযান কোনো সাময়িক তৎপরতা নয়। এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান পূর্ণ শক্তিতে অব্যাহত থাকবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, পুলিশ যদি এভাবেই কোনো প্রকার ভয় বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখে, তবে খুব দ্রুতই শৈলকুপা মাদকের অভিশাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হবে। আইনের কার্যকর প্রয়োগের ফলে উপজেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত মানবিক পরিবেশে বড় হওয়ার সুযোগ পাবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ