জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংস্কার, বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং বহুপাক্ষিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে উভয় নেতার মধ্যে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
দূতাবাসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকারের নেওয়া অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলো তুলে ধরেন। বিপরীতে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বাংলাদেশের অবকাঠামোগত অগ্রগতি ও দারিদ্র্য বিমোচনের পদক্ষেপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় বিশ্বব্যাংকের চলমান বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি আরও জোরদার করার ব্যাপারে উভয় পক্ষ সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের নতুন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করেন।
বৈঠক শেষে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের মূল ফটকের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বিস্তারিত ব্রিফ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে যে বৈশ্বিক অভিঘাত তৈরি হয়েছে, তা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে বড় আকারের আর্থিক সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটে জ্বালানি আমদানির ব্যয় প্রায় ১৫% থেকে ২০% পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ ধরনের আকস্মিক বাহ্যিক চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে প্রায় $১.৫ থেকে $২ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জরুরি ঋণ ও বাজেট সহায়তা দেওয়ার জোর আশ্বাস পাওয়া গেছে।
এর আগে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ‘নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জ’-এ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশনস্থলে পৌঁছালে জাতিসংঘ সচিবালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। উদ্বোধনী পর্বে অংশ নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করার তাগিদ দেন।
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেছে। কারণ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্বশান্তি ও বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন। অধিবেশনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) শতভাগ বাস্তবায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত ১০০$ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিল দ্রুত ছাড়করণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফলপ্রসূ বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে অত্যন্ত ব্যস্ত কূটনৈতিক সময় পার করছেন। অধিবেশনের ফাঁকে তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করেন। এসব আঞ্চলিক বৈঠকে বিদ্যুৎ আমদানি-রপ্তানি, সমুদ্র অর্থনীতি, পর্যটন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অন্তত ২৫% থেকে ৩০% বৃদ্ধি করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এমন জোরালো আঞ্চলিক যোগাযোগ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করতে বিশ্বব্যাংকের মতো বড় ঋণদাতা সংস্থার দ্রুত এগিয়ে আসা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রায় ৯০% আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিতের পথে এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।
















