ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের আকস্মিক মিছিলের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছে পুলিশ। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) গভীর রাতে কোটচাঁদপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুজাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৫২ জন চিহ্নিত নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করার পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ থেকে ১২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার ভোরের আলো ফোটার পরপরই কোটচাঁদপুর শহরের কলেজ বাস স্ট্যান্ড এলাকায় কালীগঞ্জ-জীবননগর আঞ্চলিক মহাসড়কে ১০ থেকে ১৫ জন নেতাকর্মী একটি ঝটিকা মিছিল বের করেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হঠাৎ ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিভিন্ন সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে শুরু করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে মিছিলকারীরা চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থল তল্লাশি চালিয়ে ফেলে যাওয়া ৮টি বাঁশের লাঠি উদ্ধার করে, যা পরবর্তীতে মামলার মূল আলামত হিসেবে জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, কোটচাঁদপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শেখ শাহিনের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন যুবক দলীয় ব্যানার সামনে ধরে দৌড়ানোর ভঙ্গিতে স্লোগান দিচ্ছেন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৮০% থেকে ৮৫% মানুষ এই ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্ময় ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পুলিশ ভিডিওটি পর্যালোচনা করে মিছিলে অংশ নেওয়া একাধিক নেতাকর্মীর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
মামলার এজাহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও ঝিনাইদহ জেলা ও কোটচাঁদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, জনমনে আতঙ্ক তৈরি, দেশের অখণ্ডতা বিনষ্ট এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে এই গোপন মিছিল ও অপতৎপরতা চালানো হচ্ছিল। পুলিশ জানায়, আসামিরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতিসাধনের অসৎ উদ্দেশ্যে জমায়েত হয়েছিল।
কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান জানান, মামলা দায়েরের পরপরই থানা পুলিশের কয়েকটি টিম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রাতভর সাঁড়াশি অভিযান চালায়। পুলিশ ইতিমধ্যে এজাহারভুক্ত ও সন্দেহভাজন মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। ওসি আরও স্পষ্ট করেন যে, ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের ভিত্তিতে বাকি পলাতক আসামিদের দ্রুত ধরতে পুলিশের ১০০% সক্ষমতা নিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
হঠাৎ করে এমন মিছিলের কারণে সীমান্তঘেঁষা কোটচাঁদপুরের স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীদের মাঝে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সকালের দিকে দোকানপাট খুলতে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ায় কাঁচাবাজারের ব্যবসা প্রায় ১৫% থেকে ২০% ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে অন্তত $৫০০ থেকে $৭০০ ডলার সমমূল্যের গ্রামীণ লেনদেন ব্যাহত হয়। তবে পুলিশ ও প্রশাসনের দ্রুত কঠোর পদক্ষেপে কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোটচাঁদপুর পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নিষিদ্ধ সংগঠনের যেকোনো অপচেষ্টা বা বিশৃঙ্খলা শক্ত হাতে দমন করা হবে। কেউ যাতে কোনো ধরনের নাশকতামূলক বা অরাজক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, সেজন্য পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের যেকোনো ধরনের গুজব এড়িয়ে নির্ভয়ে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।
















