কোটচাঁদপুর যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া ভাউচারের তদন্ত দাবি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শামছুল ইসলামের বিরুদ্ধে অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি, সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং দায়িত্বে চরম অবহেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কোটচাঁদপুরে যোগদানের পর থেকেই তিনি পুরো দপ্তরকে নিজের খেয়ালখুশিমতো পরিচালনা করছেন। সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে মাসের অধিকাংশ কর্মদিবসে তিনি অফিসে অনুপস্থিত থাকেন। এতে যুব ঋণ, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে এসে শত শত তরুণ-তরুণী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শামছুল ইসলাম কর্মদিবসের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% সময় কর্মস্থলে থাকেন না। তিনি নিয়মিত ঝিনাইদহ শহরের মর্ডান মোড় এলাকায় নিজের ব্যক্তিগত বাসায় সময় কাটান। অফিসে মাঝেমধ্যে আসলেও উপজেলা পরিষদের পেছনের রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন গোপন পকেট গেট দিয়ে গোপনে যাতায়াত করেন। সেবাগ্রহীতারা অফিসে খোঁজ নিতে গেলে অধীনস্থ কর্মচারীরা জানান, কর্মকর্তা জেলা কার্যালয়ের জরুরি কাজে আছেন। তবে ঝিনাইদহ জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিলকিস আফরোজ এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা উল্লেখ করে বলেন, মাসিক সমন্বয় সভা ছাড়া তিনি জেলা অফিসে আসেন না।

উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দফার খরচের নথিপত্রে ব্যাপক আর্থিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাবদ ৩০ হাজার টাকা, পেট্রোল ও মোটরযান খাতে ৮ হাজার ৫০০ টাকা, আসবাবপত্র কেনা বাবদ ৪৭ হাজার টাকা, কম্পিউটার মেরামত বাবদ ১৫ হাজার টাকা এবং বৈদ্যুতিক ও অফিস সরঞ্জাম খাতে ১২ হাজার টাকা মিলিয়ে বিপুল বরাদ্দ ব্যয় দেখানো হয়েছে। এই মোট ব্যয়ের পরিমাণ আন্তর্জাতিক হিসাবে প্রায় $১,০০০ মার্কিন ডলারের সমান। তবে এসব ব্যয়ের সিংহভাগই ভুয়া বিল ও ভাউচারের মাধ্যমে তছরুপ করার অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে কোটচাঁদপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসে গিয়ে দেখা যায় চরম বেহাল দশা। প্রতিবছর নতুন আসবাবপত্র কেনার নামে লাখ লাখ টাকার ভাউচার তৈরি হলেও অফিসে এখনও পড়ে রয়েছে বহু বছরের পুরোনো জং ধরা স্টিলের আলমারি, ভাঙাচোরা ফাইল কেবিনেট ও কাঠের নড়বড়ে টেবিল। এদিকে সরকারি খরচে পাওয়া দাপ্তরিক মোটরসাইকেলটি তিনি যুবকদের কল্যাণে বা মাঠের কাজে ব্যবহার না করে নিজের শহরের বাসায় ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে আসছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মোটরসাইকেল নিজ বাড়িতে রাখার বিষয়টি ‘ভুল হয়েছে’ বলে স্বীকার করেন।

অভিযোগে আরও জানা যায়, বেকার যুবকদের জন্য সরকারি প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনার বরাদ্দ নিয়মবহির্ভূতভাবে একটি নির্দিষ্ট পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেওয়া হয়। ‘তালসার মাতৃছায়া ফাউন্ডেশন’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমেই ঘুরেফিরে অধিকাংশ বরাদ্দ ভাগাভাগি করেন এই কর্মকর্তা। স্থানীয় যুব উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রকৃত প্রশিক্ষণের মাত্র ২০% অর্থও মাঠে পৌঁছায় না, বাকি ৮০% টাকাই ভুয়া উপস্থিতির তালিকা দেখিয়ে পকেটস্থ করা হয়। ফলে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দপ্তরে এসে প্রান্তিক যুবসমাজ বারবার প্রতারিত ও হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে।

অভিযোগের বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম হোসাইন জানান, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও অফিস ফাঁকি দেওয়ার তথ্য তিনি পেয়েছেন। সরকারি অর্থের কোনো ধরনের অপচয় বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে জেলা উপপরিচালক বিলকিস আফরোজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, শামছুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যদিও অভিযুক্ত কর্মকর্তা শামছুল ইসলাম নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বেশিরভাগ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও বেকার তরুণরা এতে সন্তুষ্ট নন। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের পুরো ঘটনার বিচার ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তারা মনে করেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতি চলতে থাকলে দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি লক্ষ্য ১০০% বাধাগ্রস্ত হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ