ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলায় সামগ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা জোরদার করতে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা প্রশাসন এই গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝিনাইদহ-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। সভায় উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধ, মাদক নির্মূল এবং প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বলেন, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ কিংবা যেকোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কোনো দলীয় বা সামাজিক পরিচয় থাকতে পারে না। সমাজ থেকে মাদকের বিষবাষ্প পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে শতভাগ কঠোর অবস্থান নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, মহেশপুরের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পরিবার থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষকদের সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
মহেশপুর একটি সংবেদনশীল সীমান্তবর্তী উপজেলা হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা সভায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদক ও ভারতীয় পণ্য চোরাচালান বন্ধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বৈঠকে উপস্থিত বিজিবি ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সীমান্ত পাহারা জোরদার থাকায় সম্প্রতি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক, ফেনসিডিল ও স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য আন্তর্জাতিক হিসাবে প্রায় $২৫০,০০০ মার্কিন ডলারের বেশি। সভায় কর্মকর্তারা ঘোষণা দেন, সীমান্তবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে চোরাচালানের তৎপরতা আগের চেয়ে অন্তত ৮০% কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সভায় উপজেলার বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মহেশপুরে ধারাবাহিক বিশেষ অভিযান এবং নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কারণে এলাকায় বড় ধরনের অপরাধের হার গত কয়েক মাসে প্রায় ৩০% থেকে ৪০% কমে এসেছে। তবে সীমান্ত ও গ্রামাঞ্চলে মাদক কারবারিরা যেন নতুন কোনো সিন্ডিকেট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ, আনসার ও বিজিবির মধ্যে সার্বক্ষণিক ১০০% মাঠপর্যায়ের সমন্বয় বজায় রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ছাড়া রাতের টহল দ্বিগুণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
সভায় গ্রামীণ জনপদে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, বাল্যবিয়ে এবং বিভিন্ন হাট-বাজারে গোপনে জুয়া খেলার আসর বসার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তারা উল্লেখ করেন, গ্রামীণ এলাকার পারিবারিক ও সামাজিক সংঘাতের প্রায় ৬০% ঘটনা ঘটে মূলত সচেতনতার অভাব এবং তরুণদের মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের কারণে। তাই অভিভাবকদের প্রতি সন্তানদের চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া স্কুল চলাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের বিনাকারণে বাজারে আড্ডা দেওয়া বন্ধে বিশেষ নজরদারি চলবে।
উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দ এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে নিজ নিজ এলাকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা সমস্যা তুলে ধরেন। চেয়ারম্যানদের নিজ নিজ এলাকায় গ্রাম পুলিশকে আরও সক্রিয় করার এবং তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য গোপন না করে সরাসরি থানায় জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়। জনপ্রতিনিধিরা প্রতিশ্রুতি দেন যে, কোনো অপরাধীকে এলাকায় আশ্রয় দেওয়া হবে না এবং শান্তি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি উদ্যোগে তারা পূর্ণ সমর্থন দিয়ে পাশে থাকবেন।
সবশেষে প্রধান অতিথি এমপি মতিয়ার রহমান উপজেলার সকল সরকারি দপ্তরকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা পৌঁছে দেওয়ার জোরালো তাগিদ দেন। তিনি বলেন, এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকলে সামগ্রিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের গতি প্রায় ৯০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তিনি মহেশপুরকে একটি আধুনিক, মাদকমুক্ত ও মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন। সমাজে আইন অমান্যকারী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
















