জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় এবার বাসের ভাড়াও বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। দূরপাল্লার রুটে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ মহানগর এলাকায় ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভাড়া বৃদ্ধির এই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই শেষে আজ রাতের মধ্যেই সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে।
এর আগে গত রোববার রাতে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি এক লাফে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এতে এক দিনেই জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৭.৪%। সাধারণত ডিজেলের দাম লিটারে এক টাকা বাড়লে গণপরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি এক পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সাধারণ একটি নিয়ম প্রচলিত আছে। বাসের ভাড়া নির্ধারণে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির মাধ্যমে জ্বালানির দামের সঙ্গে গাড়ির যন্ত্রাংশ, টায়ার ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যুক্ত করার কথা থাকলেও এবার শুধু ডিজেলের বর্ধিত দামকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ না ফেলতেই সরকার এই সীমিত সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিআরটিএর বৈঠকের আগে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতারা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে সড়ক পরিবহন ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং দ্রুত ভাড়া বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান। পরিবহন নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাজারে ডিজেলের নতুন দাম অবিলম্বে কার্যকর হওয়ায় মালিকদের ট্রিপপ্রতি বাড়তি জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। ফলে প্রজ্ঞাপন জারিতে দেরি হলে তৃণমূল পর্যায়ের পরিবহন শ্রমিকেরা নিজেদের মতো বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করবেন। এতে সারা দেশে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম জানান, ডলারের ($) দাম বাড়ার কারণে গত কয়েক মাসে বাসের টায়ার, ইঞ্জিন অয়েল ও খুচরা যন্ত্রাংশের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে শুধু জ্বালানি নয়, সার্বিক পরিচালনা ব্যয় ধরেই ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল মালিকদের। তবে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাঁরা কেবল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির হারের সঙ্গেই বাসের ভাড়া সমন্বয়ে সম্মত হয়েছেন। তিনি অনতিবিলম্বে মন্ত্রণালয় থেকে ভাড়ার গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী বড় বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং মিনিবাসের ক্ষেত্রে তা ২ টাকা ৪২ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার সাধারণ ৫২ আসনের নন-এসি বাসে বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা। প্রস্তাবিত নতুন হার কার্যকর হলে দূরপাল্লার ভাড়া বেড়ে দাঁড়াবে ২ টাকা ৪৩ পয়সায়। তবে দূরপাল্লার অনেক বাসে আসন কমিয়ে ৪০ বা ৩৬টি করে আরামদায়ক ব্যবস্থা রাখা হয়, সেগুলোতে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া আরও বেশি হবে। এর সাথে যুক্ত হবে বিভিন্ন মহাসড়ক ও সেতু ব্যবহারের টোল ফি।
সরকারি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার আগেই অনেক রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অনেক দূরপাল্লার বাসে স্বাভাবিক ৫০০ টাকার টিকিটের বদলে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। অন্যদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস ও মালবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া সরকার নিয়ন্ত্রণ করে না। এসব পরিবহনের ভাড়া মালিকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া অতীতে তেলের দাম কমলে বাসভাড়া কমানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে যাত্রীরা তার কোনো সুফল পাননি।
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দূরপাল্লায় ২০ পয়সা ও মহানগরে ১৮ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয় তা সামান্য কমিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করতে পারে। মন্ত্রী ও সচিবের চূড়ান্ত পর্যালোচনার পরই ভাড়ার আনুষ্ঠানিক অঙ্ক নির্ধারণ হবে। তবে সাধারণ যাত্রীদের দাবি, ভাড়া যা-ই বাড়ানো হোক না কেন, রাস্তায় যেন কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না হয় এবং সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট প্রতিটি বাসে দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়।
















