দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর সেলাইমেশিন পেয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছে ২০টি অসচ্ছল পরিবার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পার্বত্য খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি জনপদের সুবিধাবঞ্চিত ও অনগ্রসর নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দীর্ঘ তিন মাসের নিবিড় ও কার্যকর সেলাই প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার পর দীঘিনালা সেনা জোনের পক্ষ থেকে ২০টি পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারের হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নতুন সেলাইমেশিন ও আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর এই মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের এসব পরিবারের গৃহিণীরা এখন ঘরে বসেই কাপড় সেলাইয়ের কাজ করে নিয়মিত বাড়তি আয়ের চমৎকার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন।

সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর বেলা ২:৩০টায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা সেনা জোন সদরে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সফল প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে এসব উপহার ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। দীঘিনালা জোন কমান্ডারের সার্বিক দিকনির্দেশনায় আয়োজিত এ সনদ ও সেলাইমেশিন বিতরণ অনুষ্ঠানে সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলার শুভেচ্ছা জানিয়ে সনদ ও মেশিন হস্তান্তর করেন দীঘিনালা জোনের আরএমও ক্যাপ্টেন মু. শায়খউদ্দীন সাকলাইন, অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন মো. জাহিদ হাসান জয় এবং মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার জয়নুল আবেদীন। সেনা কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণার্থীদের নিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অর্জিত কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় আহ্বান জানান।

দীঘিনালা সেনা জোন সূত্রে জানা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার দরিদ্র পরিবারের নারীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার লক্ষ্য নিয়েই সেনা ক্যাম্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই তিন মাসব্যাপী বিশেষ সেলাই প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া নারীদের নিখুঁতভাবে বিভিন্ন পোশাকের মাপ নেওয়া, কাপড় কাটা, আধুনিক ডিজাইনের পোশাক তৈরি এবং সেলাইমেশিনের প্রাথমিক মেরামতের নানা খুঁটিনাটি বিষয় হাতে-কলমে শেখানো হয়েছে। প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রয়োজনীয় কাপড়, সুতা, কাঁচি ও আনুষঙ্গিক সব উপকরণ সেনাবাহিনী ১০০% বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে, যাতে অসচ্ছল পরিবারের নারীদের কোনো আর্থিক সমস্যায় পড়তে না হয়।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, অনুন্নত পাহাড়ি জনপদে এ ধরনের বাস্তবমুখী কারিগরি উদ্যোগ সাধারণ মানুষের পরিবারের দৈনন্দিন আর্থিক চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। ঘরে বসে নিয়মিত সেলাইয়ের কাজ করে একেকজন নারী প্রতি মাসে অনায়াসে ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করতে পারবেন। বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে এই আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় $৭০ থেকে $১০০ ডলারের সমতুল্য, যা একটি সাধারণ অসচ্ছল পরিবারের মাসিক মোট আয় অন্তত ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবে। এই বাড়তি অর্থ সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের সুশিক্ষা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

নতুন সেলাইমেশিন ও সনদপত্র হাতে পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বাস ও আনন্দ প্রকাশ করেছেন প্রশিক্ষণ নেওয়া পাহাড়ি ও বাঙালি নারীরা। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এক নারী প্রশিক্ষণার্থী বলেন, ‘আগে আমাদের নিজস্ব কোনো উপার্জনের উপায় ছিল না। সংসারের প্রতিটি ছোটখাটো খরচের জন্য পরিবারের পুরুষদের ওপর নির্ভর করতে হতো। সেনাবাহিনী আমাদের দীর্ঘ তিন মাস ধরে পরম যত্নে কাজ শিখিয়েছে এবং কাজ শুরুর জন্য আজ দামি সেলাইমেশিনও উপহার দিয়েছে। এখন আমরা ঘরে বসেই কাজের অর্ডার নিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারব। নিজের আয়ের টাকায় সংসারে অবদান রাখার মতো আত্মবিশ্বাস আমরা পেয়েছি।’

দীঘিনালার সচেতন মহল মনে করছে, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়াতে সেনাবাহিনীর এমন উদ্যোগ অসাধারণ অবদান রাখছে। ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ প্রতিকূল এবং নিয়মিত কাজের ক্ষেত্রও বেশ সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সেনা সদস্যরা সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি মানুষের দারিদ্র্য দূর করতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানমূলক নানা উন্নয়নমূলক কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।

অনুষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানান, কেবল কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, কাজ করার মতো আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করলেই মানুষ দ্রুত স্বাবলম্বী হতে পারে। দীঘিনালা সেনা জোন ভবিষ্যতেও পাহাড়ি নারীদের জন্য এমন কার্যকর বৃত্তিমূলক প্রকল্প চলমান রাখবে। সেনাবাহিনী সবসময় পার্বত্য অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে বন্ধু হয়ে আছে এবং আগামী দিনেও পাহাড়ের সামগ্রিক উন্নয়ন ও শান্তি বজায় রাখতে এ ধরনের সেবামূলক কাজ পুরোদমে অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ