ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মাদক সেবনের অপরাধে আদালত ৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন। ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার ঝিনাইদহের সংশ্লিষ্ট আদালত সংক্ষিপ্ত বিচার বা সামারি ট্রায়ালের বিচারকার্য সম্পন্ন করে এই রায় ঘোষণা করেন। শৈলকুপা থানা পুলিশ নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে ওই আট ব্যক্তিকে মাদক সেবন অবস্থায় আটক করে আদালতে সোপর্দ করে। এরপর বিচারক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনগত দিক বিবেচনা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আদালতের দেওয়া আদেশে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে চারজনকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এদের মধ্যে চর বাখরবা গ্রামের আকাম উদ্দিন শেখের ছেলে টিটু শেখ (৪২), হাটফাজিলপুর গ্রামের মৃত সোনা উল্লাহ মন্ডলের ছেলে মোঃ মিজানুর রহমান (৩৪) এবং মালিপাড়ার মৃত দবের শেখের ছেলে মোঃ মান্নান শেখকে (৫৫) ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের প্রত্যেককে ১,০০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১০ দিন জেল খাটতে হবে। এছাড়া ঝাউদিয়া গ্রামের আমুদ আলী শেখের ছেলে মোঃ বিপুল শেখকে (৩৪) ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেন বিচারক।
অন্যদিকে, অপর চার আসামিকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আদালত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা করেন। এর মধ্যে কাজীপাড়ার সুশিল বিশ্বাসের ছেলে সুজয় বিশ্বাসকে (২২) ৪ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৪,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১৫ দিন সাজা ভোগ করতে হবে। কবিরপুর গ্রামের মৃত সবুর শেখের ছেলে মোঃ আনিচুর রহমানকে (৩১) ৪ মাস ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৩,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কবিরপুরের আমজাদ শেখের ছেলে মোঃ সুমন শেখকে (৩৫) ৩ মাস ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ১,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ঝাউদিয়ার রবিউল ইসলামের ছেলে মোঃ রাব্বি শেখকে (২৪) ৪ মাসের কারাদণ্ড ও ৩০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সামারি ট্রায়াল বা সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশি অভিযানে আটক এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ১০০% সত্যতা পাওয়ায় আদালত কোনো বিলম্ব ছাড়াই দ্রুততম সময়ে দণ্ড ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের দেওয়া জরিমানার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০,৫০০ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৮৫ থেকে $৯০ ডলারের সমতুল্য। জরিমানার অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককেই বাড়তি মেয়াদে কারাভোগ করতে হবে। সাজাপ্রাপ্তদের বয়স ২২ থেকে শুরু করে ৫৫ বছর পর্যন্ত, যা প্রমাণ করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই ক্ষতিকর নেশায় জড়াচ্ছে।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ঝিনাইদহ জেলার পুলিশ সুপারের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, মাদক কেনাবেচা এবং মাদক সেবনের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান সম্পূর্ণ আপসহীন। সমাজ থেকে মাদকের বিস্তার ৫০% বা ৬০% কমিয়ে রাখাই পুলিশের উদ্দেশ্য নয়, বরং পুরো উপজেলাকে ১০০% মাদকমুক্ত করাই তাঁদের আসল লক্ষ্য। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত মামলার পাশাপাশি এমন কঠোর ও কার্যকর প্রসিকিউশন কার্যক্রম সামনেও অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিরা শৈলকুপা থানা পুলিশের এই আইনি উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, গ্রাম ও হাট-বাজারের নির্জন জায়গাগুলোতে মাদকাসক্তদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। অনেকে মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছিল। আদালতের মাধ্যমে মাদকসেবীদের এমন দ্রুত সাজা দেওয়ার ঘটনা অন্য মাদকসেবীদের কাছে স্পষ্ট সতর্কবার্তা পৌঁছে দেবে। এর ফলে তরুণ সমাজ মাদক গ্রহণ থেকে দূরে থাকবে এবং পরিবারগুলো মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
শৈলকুপা থানা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, মাদকের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভাঙতে উপজেলার প্রতিটি গ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো মাদক কারবারি বা মাদকসেবী যেন আইনের হাত থেকে পার না পায়, সেজন্য পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। মাদকের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে পরিচয় গোপন রেখে দ্রুত অভিযান চালানো হবে। এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাদকমুক্ত সুন্দর সমাজ গঠনে থানা পুলিশ সর্বস্তরের জনগণের সার্বিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।
















