প্রতিবছরের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা অত্যন্ত জরুরি একটি দায়িত্ব। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ম অনুযায়ী, দশম গ্রেড বা তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সময়মতো ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল না করলে পরবর্তী সময়ে বেতন ও ভাতা উত্তোলনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। অনেক চাকরিজীবীর মনেই প্রশ্ন রয়েছে যে, জুলাই থেকে ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো কি এবারের রিটার্নে কোনো প্রভাব ফেলবে? রাজস্ব কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সদ্য কার্যকর হওয়া নতুন বেতন স্কেলের হিসাব এবারের রিটার্নে আসবে না। এবারের রিটার্নে মূলত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্জিত আয়ের হিসাব দেখাতে হবে। এনবিআরের নতুন নিয়মে এখন করদাতারা সারা বছরই তাঁদের রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো সাধারণ বেসরকারি খাতের চেয়ে কিছুটা আলাদা হওয়ায় করযোগ্য আয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের পুরো বেতন ভাতার ওপর সরাসরি কর বসে না। সরকারি বিধি অনুযায়ী, মূল বেতন, উৎসব বোনাস এবং ইনসেনটিভ বোনাস ছাড়া অন্য কোনো নিয়মিত ভাতার ওপর কর দিতে হয় না। যেমন বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও বাংলা নববর্ষ ভাতা সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধার আওতাভুক্ত। ফলে এসব খাতে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি মোট করযোগ্য আয়ের বাইরে থাকবে, যা চাকরিজীবীদের বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি দেয়।
বিষয়টি সহজে বুঝতে শরিফুল ইসলাম নামের একজন সরকারি কর্মকর্তার উদাহরণ বিবেচনা করা যাক। তিনি মাসে ৩৫,৫০০ টাকা মূল বেতন পান। সেই হিসাবে ১২ মাসে তাঁর মূল বেতন দাঁড়ায় ৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। বছরে দুটি উৎসব বোনাস বাবদ তিনি পান ৭১,০০০ টাকা। এছাড়া অর্থবছরটিতে তিনি ইনসেনটিভ বোনাস হিসেবে পান ১ লাখ ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এর বাইরে তিনি প্রতি মাসে ১৪,২০০ টাকা বাড়িভাড়া এবং বছরে ১৮,০০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও ৭,১০০ টাকা বৈশাখী ভাতা পেলেও সেগুলো করমুক্ত। ফলে ২০২৫-২৬ করবর্ষে শরিফুল ইসলামের সব মিলিয়ে মোট করযোগ্য আয় দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
এবার আসা যাক করের অঙ্কে। প্রচলিত আয়কর আইন অনুযায়ী, বার্ষিক আয়ের প্রথম ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত করের হার ০% বা সম্পূর্ণ করমুক্ত। ফলে শরিফুল ইসলামের মোট করযোগ্য আয় ৬ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে করমুক্ত ৪ লাখ টাকা বাদ দিলে অবশিষ্ট থাকে ২ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এই অবশিষ্ট অঙ্কের ওপর প্রথম ধাপের ১০% হারে কর আরোপিত হবে। হিসাব করলে দেখা যায়, ১০ শতাংশ হারে তাঁর মোট প্রদেয় করের অঙ্ক দাঁড়ায় ২০,৩৫০ টাকা। এই অঙ্কটি হলো তাঁর ওপর আরোপিত প্রাথমিক কর। তবে তিনি আইনসম্মতভাবে বিনিয়োগ করে এই কর কমাতে পারেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন থেকে প্রতি মাসে বিভিন্ন তহবিলে টাকা কাটা হয়, যা কর রেয়াতের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়। শরিফুল ইসলাম তাঁর জিপিএফ বা সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে মাসে ৪,০০০ টাকা করে বছরে মোট ৪৮,০০০ টাকা জমা রাখেন। এছাড়া কল্যাণ তহবিলে মাসে ১৫০ টাকা হিসাবে বছরে ১,৮০০ টাকা এবং গোষ্ঠী বিমা তহবিলে মাসে ১০০ টাকা হিসাবে বছরে ১,২০০ টাকা চাঁদা দেন। সব মিলিয়ে তাঁর অনুমোদনযোগ্য মোট বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৫১,০০০ টাকা। দেশের বিদ্যমান কর আইনে বিনিয়োগজনিত রেয়াত পাওয়ার নিয়ম হলো মোট আয়ের ৩% বা ১৮,১০৫ টাকা, মোট অনুমোদনযোগ্য বিনিয়োগের ১০% বা ৫,১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ সীমা সাড়ে ৭ লাখ টাকা (যা প্রায় ৬,০০০ মার্কিন ডলার বা $ সমমূল্য) এই তিনটির মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম, করদাতা ঠিক সেই পরিমাণ রেয়াত পাবেন। ফলে শরিফুল ইসলাম সর্বোচ্চ ৫,১০০ টাকা কর রেয়াত পাওয়ার অধিকারী।
সবশেষে চূড়ান্ত হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে, কর্মকর্তা শরিফুল ইসলামের ওপর আরোপিত মোট প্রাথমিক কর ছিল ২০,৩৫০ টাকা। সেখান থেকে তাঁর প্রাপ্য কর রেয়াত ৫,১০০ টাকা সরাসরি বাদ দিলে চূড়ান্ত প্রদেয় কর দাঁড়ায় ১৫,২৫০ টাকা। অর্থাৎ এই করবর্ষে তাঁকে ব্যাংকে বা অনলাইন মাধ্যমে ১৫,২৫০ টাকা আয়কর পরিশোধ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে প্রাপ্ত প্রত্যয়নপত্র এবং জিপিএফ স্লিপ সংগ্রহে রাখলে খুব সহজেই এই রিটার্ন প্রস্তুত করা সম্ভব। কর্মকর্তারা সঠিক নিয়মে এই হিসাব মিলিয়ে সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে বেতন সংক্রান্ত যে কোনো জটিলতা অনায়াসেই এড়িয়ে চলতে পারবেন।
















